WBBSE Class 8 Poribesh O Biggan Chapter 5 প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ | Lightning & Static Electricity

Class 8 Poribesh O Bigyan Chapter 5 Question Answer Chapter 5: প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণির পরিবেশ ও বিজ্ঞান – পঞ্চম অধ্যায়: প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ (গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর)

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ের ‘প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ (বজ্রপাত ও স্থির তড়িৎ)’ অধ্যায়টি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের সহজে মনে রাখার ও পরীক্ষায় নিখুঁত উত্তর লেখার সুবিধার্থে এই অধ্যায়ের বাছাই করা বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) এবং তাদের সহজ বিশ্লেষণ নিচে আলোচনা করা হলো।


১. শীতকালে উলের জামা খোলার সময় চিঁড় চিঁড় শব্দ হওয়ার মূল কারণ কী?

ক) তাপ উৎপন্ন হওয়া
খ) স্থির তড়িতের ক্ষরণ (Static Discharge)
গ) বায়ুর প্রবল চাপ
ঘ) জামার সুতো ছিঁড়ে যাওয়া

সঠিক উত্তর: খ) স্থির তড়িতের ক্ষরণ (Static Discharge)

বিশ্লেষণ: শীতকালে বাতাস শুষ্ক থাকে। উলের জামা শরীরের সাথে ঘষা খাওয়ার ফলে তাতে স্থির তড়িৎ (Static Electricity) জমা হয়। জামা খোলার সময় সেই জমে থাকা আধান হঠাৎ মুক্ত (Discharge) হয়, যার ফলে ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ এবং চিঁড় চিঁড় শব্দ তৈরি হয়।

২. অন্ধকারে নাইলনের মশারির সাথে ঘর্ষণের ফলে কী উৎপন্ন হয়?

ক) তাপ
খ) আলো
গ) তড়িৎ আধান ও ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ
ঘ) চুম্বকত্ব

সঠিক উত্তর: গ) তড়িৎ আধান ও ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ

বিশ্লেষণ: শীতের রাতে অন্ধকার ঘরে উলের জামা পরে নাইলনের মশারির গায়ে হাত বোলালে ঘর্ষণের ফলে স্থির তড়িৎ তৈরি হয়। অন্ধকারে নীলচে রঙের ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় এবং চিঁড় চিঁড় শব্দ শোনা যায়, যা স্থির তড়িতের উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ।

৩. ‘স্থির তড়িৎ’ (Static Electricity) বলতে ঠিক কী বোঝায়?

ক) প্রবাহিত তড়িৎ
খ) কোনো বস্তুতে স্থির অবস্থায় জমে থাকা তড়িৎ আধান
গ) ব্যাটারির তড়িৎ
ঘ) চৌম্বক তড়িৎ

সঠিক উত্তর: খ) কোনো বস্তুতে স্থির অবস্থায় জমে থাকা তড়িৎ আধান

বিশ্লেষণ: ঘর্ষণ বা আবেশের ফলে কোনো অপরিবাহী (অন্তরিত) বস্তুতে তড়িৎ আধান উৎপন্ন হয়ে যদি তা স্থির অবস্থায় জমে থাকে, তবে তাকে স্থির তড়িৎ বলে। এটি হঠাৎ স্ফুলিঙ্গ আকারে নির্গত হতে পারে।

৪. একটি ড্রাইসেলের গায়ে 1.5 V লেখা থাকে — এটি কী নির্দেশ করে?

ক) তড়িৎ প্রবাহ
খ) বিভব পার্থক্য (Potential Difference)
গ) তড়িৎ ক্ষমতা
ঘ) রোধ

সঠিক উত্তর: খ) বিভব পার্থক্য (Potential Difference)

বিশ্লেষণ: 1.5 V (ভোল্ট) কথাটির অর্থ হলো ড্রাইসেলের দুই প্রান্তের মধ্যে 1.5 ভোল্ট বিভব পার্থক্য (Potential Difference) রয়েছে। এই বিভব পার্থক্যই তড়িৎ প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি; এটি না থাকলে তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে না।

৫. ‘তড়িৎ প্রবাহ’ (Electric Current) কাকে বলে?

ক) আধানের স্থির অবস্থা
খ) আধানের প্রবাহ বা চলাচল
গ) বিভব পার্থক্য
ঘ) তাপের সঞ্চালন

সঠিক উত্তর: খ) আধানের প্রবাহ বা চলাচল

বিশ্লেষণ: কোনো পরিবাহীর (যেমন- তার) মধ্য দিয়ে তড়িৎ আধানের (ইলেকট্রন বা আয়ন) একমুখী চলাচলকেই তড়িৎ প্রবাহ বলে। ধাতব তারে ইলেকট্রনের প্রবাহ এবং তরলে আয়নের চলাচল উভয়েই এর উদাহরণ।

৬. বায়ুর মধ্য দিয়ে আয়নের চলাচলকে কী বলা যেতে পারে?

ক) তড়িৎ প্রবাহ
খ) তাপ প্রবাহ
গ) শব্দ তরঙ্গ
ঘ) আলোক তরঙ্গ

সঠিক উত্তর: ক) তড়িৎ প্রবাহ

বিশ্লেষণ: বায়ুর মধ্য দিয়ে ধনাত্মক বা ঋণাত্মক তড়িৎকণা (আয়ন)-এর চলাচল ঘটলেও তাকে তড়িৎ প্রবাহ (Electric Current) বলা যায়। তবে বায়ুতে এই প্রবাহ অতি সামান্য হওয়ায় তা মাপার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র প্রয়োজন।

৭. আকাশে বজ্রপাত সৃষ্টিকারী মেঘের বিজ্ঞানসম্মত নাম কী?

ক) স্ট্র্যাটাস
খ) কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus)
গ) সাইরাস
ঘ) নিম্বোস্ট্র্যাটাস

সঠিক উত্তর: খ) কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus)

বিশ্লেষণ: কিউমুলোনিম্বাস হলো ‘বজ্রবিদ্যুৎ ভরা বর্ষণ মেঘ’। এই বিশাল ও ঘন মেঘ থেকেই বজ্রপাতসহ প্রবল বৃষ্টি হয়। এর ওপরের অংশে বরফের টুকরো জমা থাকে।

৮. কিউমুলোনিম্বাস মেঘের উচ্চতা সর্বাধিক কত হতে পারে?

ক) ২-৩ কিমি
খ) ৫-৬ কিমি
গ) ১২-১৩ কিমি বা তার বেশি
ঘ) ২০-২৫ কিমি

সঠিক উত্তর: গ) ১২-১৩ কিমি বা তার বেশি

বিশ্লেষণ: জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু ওপরে উঠতে থাকলে ঠান্ডা হয়ে জলকণায় পরিণত হয় এবং লীনতাপ নির্গত করে। এই তাপে বায়ু আরও হালকা হয়ে ওপরে উঠতে থাকে। এইভাবে মেঘ ১২-১৩ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে বিশাল আকার ধারণ করে।

৯. মেঘের জলকণাগুলি কীভাবে তড়িৎগ্রস্ত (Charged) হয়?

ক) সূর্যের প্রখর তাপে
খ) বায়ুতে আগে থেকে থাকা আহিত কণা জলকণার গায়ে জমে
গ) চুম্বকের প্রভাবে
ঘ) বৃষ্টির জলে

সঠিক উত্তর: খ) বায়ুতে আগে থেকে থাকা আহিত কণা জলকণার গায়ে জমে

বিশ্লেষণ: আমাদের বায়ুমণ্ডলে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের আহিত কণা বা আয়ন উপস্থিত থাকে। মেঘের মধ্যে জলকণা ও বরফকুচি ওপরে-নিচে চলাচলের সময় এই আহিত কণাগুলি তাদের গায়ে আটকে যায়, ফলে মেঘ তড়িৎগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

১০. কিউমুলোনিম্বাস মেঘের নীচের দিক সাধারণত কী ধরনের আধানে আহিত হয়?

ক) ধনাত্মক (+)
খ) ঋণাত্মক (-)
গ) নিরপেক্ষ
ঘ) কখনো ধনাত্মক কখনো ঋণাত্মক

সঠিক উত্তর: খ) ঋণাত্মক (-)

বিশ্লেষণ: ভারী হয়ে নিচে নামতে থাকা জলকণাগুলিতে সাধারণত ঋণাত্মক (-) আধান জমা হয়। অন্যদিকে, ওপরে উঠতে থাকা হালকা জলকণাগুলিতে ধনাত্মক (+) আধান জমে। ফলে মেঘের নিচের দিক ঋণাত্মক ও ওপরের দিক ধনাত্মক তড়িৎগ্রস্ত হয়।

১১. মেঘ যখন মাটির কাছাকাছি আসে, তখন তড়িৎ আবেশের ফলে মাটিতে কী ধরনের আধান জমা হয়?

ক) ঋণাত্মক
খ) ধনাত্মক
গ) নিরপেক্ষ
ঘ) কোনো আধান জমে না

সঠিক উত্তর: খ) ধনাত্মক

বিশ্লেষণ: মেঘের নিচের দিক প্রবলভাবে ঋণাত্মক (-) তড়িৎগ্রস্ত থাকে। মেঘ মাটির কাছাকাছি এলে, তড়িৎ আবেশের (Electrostatic Induction) প্রভাবে মাটিতে বিপুল পরিমাণ ধনাত্মক (+) আধান জমা হতে শুরু করে।

১২. মেঘ ও মাটির মধ্যে বিভব পার্থক্য অত্যন্ত বেশি হলে কী ঘটনা ঘটে?

ক) শুধু বৃষ্টি হয়
খ) বজ্রপাত (Lightning) — প্রকাণ্ড স্ফুলিঙ্গ আকারে আধান ক্ষরিত হয়
গ) কুয়াশা হয়
ঘ) রংধনু ওঠে

সঠিক উত্তর: খ) বজ্রপাত (Lightning) — প্রকাণ্ড স্ফুলিঙ্গ আকারে আধান ক্ষরিত হয়

বিশ্লেষণ: মেঘ ও মাটির মধ্যে বিভব পার্থক্য যখন কোটি কোটি ভোল্টে পৌঁছায়, তখন বায়ুর অন্তরক ধর্ম (বিদ্যুৎ বাধা দেওয়ার ক্ষমতা) ভেঙে যায়। তখন প্রকাণ্ড স্ফুলিঙ্গের (Spark) আকারে ঋণাত্মক আধান মেঘ থেকে সোজা মাটিতে নেমে আসে। একেই আমরা বজ্রপাত বলি।

১৩. বজ্রপাতের সময় বায়ু অত্যন্ত গরম হয়ে যায় — এর ফলাফল কী হয়?

ক) বৃষ্টি শুরু হয়
খ) বায়ুতে সাময়িক শূন্যতা ও প্রচণ্ড কম্পন (Thunder) সৃষ্টি হয়
গ) কুয়াশা সৃষ্টি হয়
ঘ) তুষারপাত হয়

সঠিক উত্তর: খ) বায়ুতে সাময়িক শূন্যতা ও প্রচণ্ড কম্পন (Thunder) সৃষ্টি হয়

বিশ্লেষণ: প্রবল তড়িৎ প্রবাহের ফলে চারপাশের বায়ু কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে প্রচণ্ড গরম (প্রায় ৩০,০০০°C) হয়ে হঠাৎ প্রসারিত হয়। এর ফলে সেখানে সাময়িক শূন্যতা (Vacuum) তৈরি হয়। সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য চারপাশের বায়ু প্রবল বেগে ধেয়ে এলে এক প্রচণ্ড কম্পন বা শকওয়েভ তৈরি হয়, যা আমরা মেঘের গর্জন বা বিকট শব্দ হিসেবে শুনতে পাই।

১৪. বজ্রপাতের সময় আলোর ঝলক আগে দেখা যায়, কিন্তু শব্দ পরে শোনা যায় — এর কারণ কী?

ক) আলো পরে সৃষ্টি হয়
খ) আলোর বেগ শব্দের বেগের চেয়ে অনেক বেশি
গ) শব্দ বাতাসে থেমে যায়
ঘ) মানুষের কান দুর্বল

সঠিক উত্তর: খ) আলোর বেগ শব্দের বেগের চেয়ে অনেক বেশি

বিশ্লেষণ: বজ্রপাত ও শব্দ একই সাথে উৎপন্ন হয়। কিন্তু আলো সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার (3×10⁸ m/s) বেগে ছোটে, যেখানে বাতাসে শব্দের বেগ মাত্র ৩৪০ মিটার/সেকেন্ড। তাই আলোর ঝলক আমরা প্রায় সাথে সাথেই দেখতে পাই, কিন্তু শব্দ আমাদের কানে পৌঁছতে বেশ কিছুটা সময় নেয়।

১৫. বজ্রপাত সাধারণত কাদের মধ্যে ঘটতে পারে?

ক) শুধু মেঘ ও মাটির মধ্যে
খ) দুটি ভিন্ন মেঘের মধ্যে অথবা একই মেঘের ভিন্ন অংশের মধ্যে
গ) শুধু আকাশে
ঘ) শুধু সমুদ্রে

সঠিক উত্তর: খ) দুটি ভিন্ন মেঘের মধ্যে অথবা একই মেঘের ভিন্ন অংশের মধ্যে

বিশ্লেষণ: বজ্রপাত মূলত তিনভাবে হতে পারে: ১. মেঘ থেকে মাটিতে (সবচেয়ে বিপজ্জনক), ২. দুটি আলাদা মেঘের মধ্যে এবং ৩. একই মেঘের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক অংশের মধ্যে। সব ক্ষেত্রেই মূল কারণ হলো বিপুল পরিমাণ বিভব পার্থক্য।

১৬. বজ্রপাতের সময় লম্বা গাছের নীচে দাঁড়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক কেন?

ক) গাছটি ভেঙে পড়ে যেতে পারে
খ) গাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে (সুউচ্চ বস্তু হিসেবে)
গ) গাছ থেকে প্রচুর জল পড়ে
ঘ) গাছ জ্বলে যেতে পারে

সঠিক উত্তর: খ) গাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে (সুউচ্চ বস্তু হিসেবে)

বিশ্লেষণ: বজ্রপাত মেঘ থেকে মাটিতে নামার জন্য সবচেয়ে কাছের পথ (সুউচ্চ বস্তু) বেছে নেয়। লম্বা গাছ খোলা মাঠে সবচেয়ে উঁচু বস্তু হওয়ায় এটি বজ্রপাতকে সহজেই আকর্ষণ করে। গাছের নিচে দাঁড়ালে বিদ্যুৎ গাছ বেয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে না দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে বসে পড়া উচিত।

অষ্টম শ্রেণির পরিবেশ ও বিজ্ঞান – পঞ্চম অধ্যায়: প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ (SAQ ও রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর)

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ের ‘প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ’ (বজ্রপাত ও স্থির তড়িৎ) অধ্যায়টি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের সহজে মনে রাখার ও পরীক্ষায় নিখুঁত উত্তর লেখার সুবিধার্থে এই অধ্যায়ের বাছাই করা সংক্ষিপ্ত ও বড়ো প্রশ্নোত্তরগুলো সহজ ভাষায় নিচে আলোচনা করা হলো।


সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (SAQ) – মান ২/৩

১. স্থির তড়িৎ (Static Electricity) কী? দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি উদাহরণ দাও।

স্থির তড়িৎ: ঘর্ষণ বা আবেশের ফলে কোনো অপরিবাহী (অন্তরিত) বস্তুতে তড়িৎ আধান উৎপন্ন হয়ে যদি তা স্থির অবস্থায় জমে থাকে, তবে তাকে স্থির তড়িৎ বলে। এটি হঠাৎ স্ফুলিঙ্গ আকারে মুক্ত হতে পারে।

দৈনন্দিন উদাহরণ:
১. শীতকালে উলের জামা খোলার সময় ঘর্ষণের ফলে জমে থাকা স্থির তড়িৎ মুক্ত হয়ে ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ ও চিঁড় চিঁড় শব্দ তৈরি করে।
২. প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে শুকনো চুল আঁচড়ালে চিরুনি তড়িতাহিত হয়ে ছোটো কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে।

২. বিভব পার্থক্য (Potential Difference) কাকে বলে? তড়িৎ প্রবাহের সাথে এর সম্পর্ক কী?

বিভব পার্থক্য: কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের মধ্যে তড়িৎ বিভবের যে পার্থক্য থাকে, তাকেই বিভব পার্থক্য বলে। এর একক হলো ভোল্ট (V)।

সম্পর্ক: বিভব পার্থক্য হলো তড়িৎ প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি (Driving Force)। যেমন জলের উচ্চতার পার্থক্য না থাকলে জল প্রবাহিত হয় না, তেমনি বিভব পার্থক্য না থাকলে তারের মধ্য দিয়ে কোনো তড়িৎ প্রবাহিত হয় না।

৩. কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ কীভাবে গঠিত হয়? এর বৈশিষ্ট্য লেখো।

গঠন: জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস ওপরের দিকে উঠে ঠান্ডা হয়ে মেঘ তৈরি করে। বাষ্প জলে পরিণত হওয়ার সময় লীনতাপ ছাড়ে, যা মেঘকে আরও হালকা করে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। এভাবে মেঘ ১২-১৩ কিমি উঁচু হয়ে বিশাল আকার ধারণ করে। একেই কিউমুলোনিম্বাস মেঘ বলে।

বৈশিষ্ট্য: এই মেঘের ওপরের দিক ধনাত্মক (+) এবং নিচের দিক প্রবল ঋণাত্মক (-) তড়িৎগ্রস্ত থাকে। এই মেঘ থেকেই ভয়ঙ্কর বজ্রপাত ও মুষলধারে বৃষ্টি হয়।

৪. বজ্রপাতের সময় মেঘে আধান পৃথকীকরণ (Charge Separation) কীভাবে ঘটে?

বায়ুমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন আহিত কণা বা আয়ন মেঘের জলকণা ও বরফকুচির গায়ে আটকে যায়। মেঘের মধ্যে প্রবল হাওয়ায় যখন এই জলকণাগুলো ওঠা-নামা করে, তখন ভারী হয়ে নিচে নামতে থাকা কণাগুলোতে ঋণাত্মক (-) আধান এবং ওপরে ওঠা হালকা কণাগুলোতে ধনাত্মক (+) আধান জমা হয়। ফলে মেঘের ওপর ও নিচ আধানের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়।

৫. বজ্রপাত (Lightning Strike) কীভাবে ঘটে?

মেঘের নিচের অংশ প্রবল ঋণাত্মক (-) আধানে আহিত থাকে। এটি যখন মাটির কাছাকাছি আসে, তখন তড়িৎ আবেশের ফলে মাটিতে বিপুল ধনাত্মক (+) আধান জমা হয়। মেঘ ও মাটির মধ্যে এই বিভব পার্থক্য যখন কোটি কোটি ভোল্টে পৌঁছায়, তখন বাতাসের বাধা ভেঙে প্রকাণ্ড স্ফুলিঙ্গের আকারে তড়িৎ মেঘ থেকে মাটিতে নেমে আসে। একেই বজ্রপাত বলে।

৬. বজ্রপাতের আলো আগে দেখা যায়, কিন্তু শব্দ পরে শোনা যায় কেন?

বজ্রপাত ও শব্দ একই সাথে আকাশে উৎপন্ন হয়। কিন্তু আলোর বেগ (সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিমি) শব্দের বেগের (বাতাসে সেকেন্ডে মাত্র ৩৪০ মিটার) চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাই বজ্রপাতের আলোর ঝলকানি আমরা প্রায় সাথে সাথেই দেখতে পাই, কিন্তু শব্দ কান পর্যন্ত পৌঁছতে কিছুটা সময় নেয়।

৭. বজ্রপাত সাধারণত কাদের মধ্যে ঘটতে পারে?

বিভব পার্থক্য চরমে পৌঁছালে তিনভাবে বজ্রপাত হতে পারে:
১. মেঘ ও মাটির মধ্যে: এটি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
২. দুটি আলাদা মেঘের মধ্যে: আকাশে আলোর ঝলকানি দেখা যায়, কিন্তু মাটিতে আঘাত করে না।
৩. একই মেঘের মধ্যে: মেঘের নিচের ঋণাত্মক ও ওপরের ধনাত্মক অংশের মধ্যে।

৮. বজ্রপাতের সময় কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

  • করণীয়: বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত পাকা বাড়ি বা গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠে থাকলে মাথা নিচু করে পা গুটিয়ে বসে পড়তে হবে। জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে।
  • বর্জনীয়: কোনোভাবেই লম্বা গাছের নিচে দাঁড়ানো যাবে না। মোবাইল বাদে ল্যান্ডলাইন বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির তার স্পর্শ করা যাবে না। ছাতা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (Broad Questions) – মান ৫

১. ঘর্ষণের মাধ্যমে কীভাবে স্থির তড়িৎ উৎপন্ন হয় তা পরীক্ষাসহ ব্যাখ্যা করো। এর কয়েকটি ব্যবহারিক প্রয়োগ লেখো।

তড়িৎ উৎপাদন: দুটি আলাদা বস্তুকে একে অপরের সাথে ঘষলে একটি বস্তু থেকে ইলেকট্রন অন্য বস্তুতে চলে যায়। যে বস্তু ইলেকট্রন হারায় তা ধনাত্মক (+) এবং যে বস্তু তা গ্রহণ করে তা ঋণাত্মক (-) তড়িৎগ্রস্ত হয়। এভাবেই ঘর্ষণের ফলে স্থির তড়িৎ তৈরি হয়।

পরীক্ষা: শীতের রাতে অন্ধকার ঘরে উলের জামা পরে নাইলনের মশারির গায়ে হাত বোলালে ঘর্ষণের ফলে স্থির তড়িৎ তৈরি হয়। অন্ধকারে নীলচে রঙের ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় এবং চিঁড় চিঁড় শব্দ শোনা যায়, যা আধান স্থানান্তরের প্রমাণ।

ব্যবহারিক প্রয়োগ: আধুনিক ফটোকপিয়ার বা জেরক্স মেশিন, লেজার প্রিন্টার এবং কলকারখানার চিমনি থেকে দূষক কণা আলাদা করার যন্ত্র (Electrostatic Precipitator) স্থির তড়িতের নীতির ওপর ভিত্তি করেই কাজ করে।

২. বিভব পার্থক্য ও তড়িৎ প্রবাহের ধারণা দাও। এদের মধ্যে সম্পর্ক কী? ও’মের সূত্রটি উদাহরণসহ লেখো।

বিভব পার্থক্য (V): একটি পরিবাহীর দুই প্রান্তের মধ্যে তড়িৎ শক্তির যে পার্থক্য থাকে, তাকে বিভব পার্থক্য বলে (একক: ভোল্ট)।

তড়িৎ প্রবাহ (I): পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ আধানের (ইলেকট্রন) একমুখী চলাচলকেই তড়িৎ প্রবাহ বলে (একক: অ্যাম্পিয়ার)।

সম্পর্ক ও ও’মের সূত্র: বিভব পার্থক্যই তড়িৎ প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। ও’মের সূত্র অনুযায়ী: V = I × R (যেখানে R হলো রোধ)। অর্থাৎ, রোধ স্থির থাকলে বিভব পার্থক্য যত বাড়বে, তড়িৎ প্রবাহও ঠিক ততটাই বাড়বে।

উদাহরণ: জলের ট্যাঙ্ক যত উঁচুতে (বেশি বিভব) রাখা হবে, পাইপ দিয়ে জল ঠিক ততটাই বেশি বেগে (বেশি তড়িৎ প্রবাহ) নিচের দিকে পড়বে।

৩. বজ্রপাতের সময় প্রচণ্ড মেঘ গর্জনের (Thunder) সৃষ্টি হয় কেন?

বজ্রপাত যখন মেঘ থেকে মাটিতে নেমে আসে, তখন বাতাসের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। এর ফলে চারপাশের বাতাস মুহূর্তের মধ্যে সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও প্রায় ৫ গুণ বেশি গরম (প্রায় ৩০,০০০°C) হয়ে হঠাৎ প্রসারিত হয়। এর ফলে সেখানে সাময়িক শূন্যতা বা ভ্যাকুয়াম (Vacuum) তৈরি হয়। সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য চারপাশের বাতাস প্রবল বেগে ছুটে এলে এক প্রচণ্ড সংঘাত তরঙ্গ বা শকওয়েভ (Shockwave) তৈরি হয়। বাতাসের এই প্রচণ্ড আলোড়নকেই আমরা মেঘের গর্জন বা বিকট শব্দ (Thunder) হিসেবে শুনতে পাই।

৪. বজ্রপাত নিরোধক বা লাইটনিং কন্ডাক্টর (Lightning Conductor) কী? এটি কীভাবে কাজ করে?

বজ্রপাত নিরোধক: উঁচু বহুতল বা বাড়িকে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বাড়ির ছাদে যে ত্রিশূলের মতো ধাতব দণ্ড বসানো থাকে, তাকে বজ্রপাত নিরোধক বলে।

কীভাবে কাজ করে: ছাদের ওপরে থাকা ওই ধাতব দণ্ডটি (তামা বা অ্যালুমিনিয়াম) একটি মোটা তারের সাহায্যে সরাসরি মাটির অনেক গভীরে পোঁতা একটি ধাতব পাতের সাথে যুক্ত থাকে। বজ্রপাত মেঘ থেকে সবচেয়ে কাছের উঁচু বস্তু খোঁজে। তাই বজ্রপাত হলে তা সরাসরি ওই ধাতব দণ্ডে আঘাত করে এবং তারের মাধ্যমে নিরাপদে মাটিতে চলে যায়। এর ফলে বাড়িটি এবং ভেতরের মানুষ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।

৫. প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে বজ্রপাতের কোনো উপকারিতা বা গুরুত্ব আছে কি?

বজ্রপাতকে আমরা শুধুমাত্র ধ্বংসাত্মক মনে করলেও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এর ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।

১. নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণ (Nitrogen Fixation): বাতাসে থাকা নাইট্রোজেন গ্যাসকে গাছ সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপে বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড এবং পরে নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে। এটি বৃষ্টির জলের সাথে মাটিতে পড়ে প্রাকৃতিকভাবে মাটির উর্বরতা বাড়ায় ও উদ্ভিদের পুষ্টি জোগায়।

২. বৈদ্যুতিক ভারসাম্য: পৃথিবী এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক সার্কিট কাজ করে। বজ্রপাত পৃথিবীর এই গ্লোবাল তড়িৎ ভারসাম্য (Global Electrical Circuit) বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৬. বজ্রপাতের ঘটনায় ‘তড়িৎ আবেশ’ (Induction)-এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।

তড়িৎ আবেশ: কোনো চার্জযুক্ত বস্তুকে স্পর্শ না করে শুধু কাছাকাছি এনে অন্য বস্তুতে বিপরীত আধান তৈরি করার প্রক্রিয়াকেই আবেশ বলে।

বজ্রপাতে ভূমিকা: কিউমুলোনিম্বাস মেঘের নিচের দিক প্রবল ঋণাত্মক (-) আধানে আহিত থাকে। এই মেঘ যখন মাটির খুব কাছাকাছি আসে, তখন তড়িৎ আবেশের ফলে মাটির ইলেকট্রনগুলো দূরে সরে যায় এবং মাটির উপরিভাগে বিপুল ধনাত্মক (+) আধান জমা হয়। এই আবেশের ফলেই মেঘ ও মাটির মধ্যে কোটি কোটি ভোল্টের বিভব পার্থক্য তৈরি হয়, যা বাতাস ভেদ করে বজ্রপাত ঘটানোর জন্য মূল কারণ।


💡 একনজরে মনে রেখো! (Quick Revision Tips)

  • স্থির তড়িৎ: ঘর্ষণের ফলে তৈরি হয় এবং জমে থাকে। হঠাৎ স্ফুলিঙ্গ আকারে মুক্ত হয়।
  • বিভব পার্থক্য (V): তড়িৎ প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি।
  • কিউমুলোনিম্বাস মেঘ: বজ্রপাত সৃষ্টি করে। এর নিচে ঋণাত্মক (-) এবং ওপরে ধনাত্মক (+) আধান থাকে।
  • আলো আগে ও শব্দ পরে: আলোর গতিবেগ শব্দের চেয়ে অনেক বেশি বলে।
  • বজ্রপাতে সতর্কতা: লম্বা গাছের নিচে দাঁড়ানো বা জলাশয়ে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

Leave a Comment