WBBSE Class 8 History Chapter 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ – MCQ প্রশ্ন ও উত্তর
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর (MCQ)
১. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
ক) কলকাতা খ) মাদ্রাজ গ) বোম্বাই ঘ) পুনা
সঠিক উত্তর: গ) বোম্বাই
ব্যাখ্যা: ১৮৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বোম্বাই শহরের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন বসে। প্রথমে পুনায় অধিবেশন করার পরিকল্পনা থাকলেও কলেরার প্রাদুর্ভাবের কারণে স্থান পরিবর্তন করে বোম্বাইয়ে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
২. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় খ) দাদাভাই নওরোজি গ) উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঘ) অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম
সঠিক উত্তর: গ) উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ছিলেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে কাজ করতেন।
৩. অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম কে ছিলেন?
ক) ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী খ) অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আমলা গ) ভারতের একজন রাজা ঘ) ফরাসি দার্শনিক
সঠিক উত্তর: খ) অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আমলা
ব্যাখ্যা: অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তিনি একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির উদ্যোগ নেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
৪. হিউম-ডাফরিনের ‘সেফটি ভালভ’ তত্ত্ব বলতে কী বোঝায়?
ক) ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার পরিকল্পনা খ) ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য কংগ্রেসকে একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা গ) জাতীয় কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা ঘ) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার তত্ত্ব
সঠিক উত্তর: খ) ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য কংগ্রেসকে একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা
ব্যাখ্যা: সেফটি ভালভ তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশের জন্য কংগ্রেস গঠন করা হয়েছিল। এই ধারণায় হিউম ও লর্ড ডাফরিনের ভূমিকার কথা বলা হয়। তবে এই তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
৫. ১৮৫৭ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত সময়কে কী বলা হয়?
ক) সংস্কারের যুগ খ) সভা-সমিতির যুগ গ) স্বাধীনতার যুগ ঘ) অন্ধকার যুগ
সঠিক উত্তর: খ) সভা-সমিতির যুগ
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর থেকে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও সভা গড়ে উঠেছিল। এসব সংগঠনের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়তে থাকে। এই কারণেই সময়টিকে সভা-সমিতির যুগ বলা হয়।
৬. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৩৬ খ) ১৮৩৮ গ) ১৮৭৫ ঘ) ১৮৭৬
সঠিক উত্তর: ক) ১৮৩৬
ব্যাখ্যা: ১৮৩৬ সালে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষা ও দেশীয় মানুষের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করাই ছিল এই সভার অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলায় প্রাথমিক রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই সংগঠনের গুরুত্ব ছিল।
৭. ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত সভা কারা এবং কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৮৮৫ খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু, ১৮৭৬ গ) দাদাভাই নওরোজি, ১৮৬৭ ঘ) বাল গঙ্গাধর তিলক, ১৮৮০
সঠিক উত্তর: খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু, ১৮৭৬
ব্যাখ্যা: ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু ভারত সভা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে রাজনৈতিক কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলাও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
৮. ইলবার্ট বিল নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় কী ছিল?
ক) ভূমি রাজস্ব আদায় খ) ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার ক্ষমতা গ) শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন ঘ) ধর্মীয় অধিকার
সঠিক উত্তর: খ) ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার ক্ষমতা
ব্যাখ্যা: ১৮৮৩ সালে ইলবার্ট বিলের মাধ্যমে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করার অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়রা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। শেষ পর্যন্ত বিলটি পরিবর্তিত হয়। এই ঘটনা ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বৈষম্যমূলক নীতি সম্পর্কে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
৯. নরমপন্থী নেতারা কোন পদ্ধতিতে নিজেদের দাবি আদায় করতে চাইতেন?
ক) সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে খ) আবেদন, নিবেদন ও আলোচনার মাধ্যমে গ) বিদেশি পণ্য বর্জনের মাধ্যমে ঘ) ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত করে
সঠিক উত্তর: খ) আবেদন, নিবেদন ও আলোচনার মাধ্যমে
ব্যাখ্যা: জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিকের নেতাদের অধিকাংশই নরমপন্থী ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে, স্মারকলিপি পাঠিয়ে এবং বিভিন্ন প্রতিনিধিদল পাঠানোর মাধ্যমে ভারতীয়দের দাবি আদায় করা সম্ভব।
১০. ‘লাল-বাল-পাল’ বলতে কোন তিনজন নেতাকে বোঝায়?
ক) লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও বিপিনচন্দ্র পাল খ) লালবাহাদুর শাস্ত্রী, বল্লভভাই প্যাটেল ও বিপিনচন্দ্র পাল গ) লর্ড লিটন, বাল গঙ্গাধর ও পলাশির নবাব ঘ) লাল, বলরাম ও পল্টু
সঠিক উত্তর: ক) লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও বিপিনচন্দ্র পাল
ব্যাখ্যা: জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তিনজন বিশিষ্ট চরমপন্থী নেতা হলেন লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক এবং বিপিনচন্দ্র পাল। তাঁদের নামের প্রথম অংশ মিলিয়ে একসঙ্গে ‘লাল-বাল-পাল’ বলা হয়। তাঁরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।
১১. চরমপন্থী নেতাদের কাছে স্বরাজের অর্থ কী ছিল?
ক) ব্রিটিশ শাসনের অধীনে স্বায়ত্তশাসন খ) ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি গ) শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ঘ) জমিদারি প্রথার অবসান
সঠিক উত্তর: খ) ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি
ব্যাখ্যা: চরমপন্থী নেতারা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে সীমিত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরিবর্তে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে স্বরাজ ছিল নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠার অধিকার। বাল গঙ্গাধর তিলকের স্বরাজ সম্পর্কিত বিখ্যাত বক্তব্য এই ধারণাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
১২. ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার কী কারণ দেখিয়েছিল?
ক) ধর্মীয় বিভাজন খ) প্রশাসনিক সুবিধা গ) ভাষাগত সমস্যা ঘ) শিক্ষার প্রসার
সঠিক উত্তর: খ) প্রশাসনিক সুবিধা
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য ছিল, বিশাল বাংলার প্রশাসন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই প্রশাসনিক কাজ সহজ করার জন্য বাংলা ভাগ করা প্রয়োজন। তবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতারা মনে করতেন, এর পিছনে ব্রিটিশদের বিভাজনের নীতি কাজ করেছিল।
১৩. বঙ্গভঙ্গ কবে কার্যকর করা হয়?
ক) ১৯০৩ সালে খ) ১৯০৫ সালে গ) ১৯০৬ সালে ঘ) ১৯১১ সালে
সঠিক উত্তর: খ) ১৯০৫ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন শুরু হয়। পরে এই আন্দোলন স্বদেশি আন্দোলনের রূপ নেয়।
১৪. স্বদেশি আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচিগুলি কী ছিল?
ক) বিদেশি পণ্য কেনা খ) স্বরাজ, স্বদেশি, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষা গ) সশস্ত্র বিপ্লব ঘ) জমিদারি প্রথার বিলোপ
সঠিক উত্তর: খ) স্বরাজ, স্বদেশি, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষা
ব্যাখ্যা: স্বদেশি আন্দোলনে চারটি প্রধান কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এগুলি হল স্বরাজ, স্বদেশি দ্রব্যের ব্যবহার, বিদেশি পণ্য বর্জন এবং জাতীয় শিক্ষার প্রসার। দেশীয় শিল্প ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও এই আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
১৫. ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ক) সেখানে স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হয় খ) নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিরোধের কারণে কংগ্রেসে বিভাজন ঘটে গ) প্রথমবার ভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন ঘ) ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেস নিষিদ্ধ করে
সঠিক উত্তর: খ) নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিরোধের কারণে কংগ্রেসে বিভাজন ঘটে
ব্যাখ্যা: ১৯০৭ সালে সুরাটে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে নরমপন্থী ও চরমপন্থী নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ চরমে ওঠে। সভাপতি নির্বাচন ও আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে দুই দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত অধিবেশন ভেঙে যায় এবং কংগ্রেসে বিভাজন ঘটে।
১৬. বঙ্গভঙ্গ কোন সালে রদ করা হয়?
ক) ১৯০৯ সালে খ) ১৯১১ সালে গ) ১৯১৯ সালে ঘ) ১৯৪৭ সালে
সঠিক উত্তর: খ) ১৯১১ সালে
ব্যাখ্যা: বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলতে থাকে। এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা করে। একই সময়ে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্তও জানানো হয়।
১৭. মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন কত সালে পাস হয়?
ক) ১৮৯২ সালে খ) ১৯০৯ সালে গ) ১৯১৯ সালে ঘ) ১৯৩৫ সালে
সঠিক উত্তর: খ) ১৯০৯ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯০৯ সালে মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়। পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা হয়।
১৮. ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী কাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন?
ক) লর্ড কার্জন খ) কিংসফোর্ড গ) লর্ড ডাফরিন ঘ) লর্ড মিন্টো
সঠিক উত্তর: খ) কিংসফোর্ড
ব্যাখ্যা: কিংসফোর্ড ছিলেন মুজাফফরপুরের একজন বিচারক। বিপ্লবীদের প্রতি কঠোর আচরণের জন্য তিনি তাঁদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে একটি গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ঘটনায় কেনেডি পরিবারের দুই মহিলা নিহত হন।
১৯. অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কে ছিলেন?
ক) বাল গঙ্গাধর তিলক খ) দাদাভাই নওরোজি গ) অরবিন্দ ঘোষ ঘ) বিপিনচন্দ্র পাল
সঠিক উত্তর: খ) দাদাভাই নওরোজি
ব্যাখ্যা: দাদাভাই নওরোজি ভারতের অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টি বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেন। তাঁর বিখ্যাত ‘Poverty and Un-British Rule in India’ বইয়ে সম্পদের বহির্গমন বা Drain of Wealth তত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে তিনি দেখান, ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতের সম্পদ কীভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছিল।
২০. নরমপন্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বিরোধীরা কী নামে ব্যঙ্গ করতেন?
ক) সাধারণ রাজনীতি খ) তিন দিনের তামাশা গ) স্বাধীনতার লড়াই ঘ) ঢাকঢোলের রাজনীতি
সঠিক উত্তর: খ) তিন দিনের তামাশা
ব্যাখ্যা: কংগ্রেসের প্রথম দিকের অধিবেশন সাধারণত বছরে একবার অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে কয়েক দিন ধরে আলোচনা ও বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণ করা হতো। চরমপন্থী নেতাদের একাংশ মনে করতেন, শুধু অধিবেশন করে এবং আবেদন জানিয়ে স্বাধীনতা বা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাই তাঁরা এই পদ্ধতিকে ‘তিন দিনের তামাশা’ বলে সমালোচনা করতেন।
২১. স্বদেশি আন্দোলনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন?
ক) গোরা খ) ঘরে বাইরে গ) ব্যাধি ও প্রতিকার ঘ) স্বদেশি সমাজ
সঠিক উত্তর: গ) ব্যাধি ও প্রতিকার
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধে স্বদেশি আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি জোর করে বিদেশি পণ্য বর্জন করানো এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ তৈরির বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর মতে, দেশের উন্নতির জন্য মানুষের মধ্যে ঐক্য ও আত্মশক্তির বিকাশ প্রয়োজন।
২২. অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীদের মধ্যে কে ছিলেন?
ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় খ) সতীশচন্দ্র বসু ও ক্ষুদিরাম বসু গ) উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঘ) মতিলাল নেহরু
সঠিক উত্তর: খ) সতীশচন্দ্র বসু ও ক্ষুদিরাম বসু
ব্যাখ্যা: বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে অনুশীলন সমিতির বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯০২ সালে সতীশচন্দ্র বসুর উদ্যোগে এই সংগঠন গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম বসু-সহ বহু বিপ্লবী এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। শরীরচর্চা ও অন্যান্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবকদের সংগঠিত করা হতো।
২৩. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন কীভাবে স্বদেশি আন্দোলনে পরিণত হয়?
ক) এটি শুধু হিন্দুদের আন্দোলন ছিল খ) বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলনটি স্বদেশি আন্দোলনে পরিণত হয় গ) এটি শুধু মুসলমানদের আন্দোলন ছিল ঘ) ব্রিটিশ কর্মচারীরা এই আন্দোলন পরিচালনা করতেন
সঠিক উত্তর: খ) বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলনটি স্বদেশি আন্দোলনে পরিণত হয়
ব্যাখ্যা: বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন। বিদেশি দ্রব্য বর্জন, দেশীয় পণ্য ব্যবহার এবং জাতীয় শিক্ষার প্রসারের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এভাবেই বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বদেশি আন্দোলনের রূপ নেয়।
২৪. সরলা দেবী চৌধুরানী কোন উৎসব চালু করেছিলেন?
ক) রাখিবন্ধন উৎসব খ) শিবাজি উৎসব গ) প্রতাপাদিত্য উৎসব ঘ) বন্দেমাতরম উৎসব
সঠিক উত্তর: গ) প্রতাপাদিত্য উৎসব
ব্যাখ্যা: বাঙালি যুবকদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সাহসের মনোভাব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে সরলা দেবী চৌধুরানী প্রতাপাদিত্য উৎসব চালু করেন। এই উৎসবে কুস্তি, লাঠিখেলা ও তলোয়ার চালানোর মতো শারীরিক কসরত দেখানো হতো। বীরত্বের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের পুরস্কৃতও করা হতো।
২৫. চরমপন্থী নেতারা ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সমালোচনা করতেন কেন?
ক) তাঁরা শিক্ষার বিরোধী ছিলেন খ) তাঁদের মতে, ঔপনিবেশিক শিক্ষা ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য বাড়াচ্ছিল গ) তাঁরা কেবল সংস্কৃত শিক্ষা চালু করতে চেয়েছিলেন ঘ) ব্রিটিশ আইন তাঁদের বাধ্য করেছিল
সঠিক উত্তর: খ) তাঁদের মতে, ঔপনিবেশিক শিক্ষা ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য বাড়াচ্ছিল
ব্যাখ্যা: চরমপন্থী নেতাদের মতে, ব্রিটিশদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ভারতীয়দের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল। তাঁরা মনে করতেন, দেশের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং জাতীয় চেতনার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
২৬. ১৮৫৮ সালের রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রে কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল?
ক) ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি খ) ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের সমান সুরক্ষা ও দেশীয় রাজ্যগুলির প্রতি সম্মান গ) জাতীয় কংগ্রেসকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ঘ) ভারতীয়দের সর্বজনীন ভোটাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
সঠিক উত্তর: খ) ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের সমান সুরক্ষা ও দেশীয় রাজ্যগুলির প্রতি সম্মান
ব্যাখ্যা: ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এতে ভারতীয়দের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আইনের চোখে সমান সুরক্ষা দেওয়া এবং দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে করা চুক্তি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যোগ্য ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের কথাও উল্লেখ করা হয়।
২৭. বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রচারে কোন পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল?
ক) হিন্দু প্যাট্রিয়ট খ) যুগান্তর গ) সোমপ্রকাশ ঘ) বেঙ্গলি
সঠিক উত্তর: খ) যুগান্তর
ব্যাখ্যা: ‘যুগান্তর’ পত্রিকা বাংলার বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রচারমাধ্যম ছিল। এই পত্রিকার লেখার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার করা হতো। বিপ্লবী আন্দোলনের প্রসারে পত্রিকাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
২৮. স্বদেশি আন্দোলনের সময় কোন কোন দেশীয় শিল্পের প্রসার ঘটেছিল?
ক) লৌহ ও ইস্পাত শিল্প খ) বস্ত্র, সাবান, দেশলাই ও চামড়া শিল্প গ) বিমান নির্মাণ শিল্প ঘ) পারমাণবিক শিল্প
সঠিক উত্তর: খ) বস্ত্র, সাবান, দেশলাই ও চামড়া শিল্প
ব্যাখ্যা: স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশীয় পণ্য ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ বাড়ে। বস্ত্র, সাবান, দেশলাই ও চামড়ার মতো বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে অনেক শিল্পের প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়।
২৯. জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে মোট কতজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির প্রতিনিধি কতজন ছিলেন?
ক) ১০০ জন ও ৫০ জন খ) ৭২ জন ও ৩৮ জন গ) ৫০ জন ও ২৫ জন ঘ) ২০০ জন ও ১০০ জন
সঠিক উত্তর: খ) ৭২ জন ও ৩৮ জন
ব্যাখ্যা: ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে মোট ৭২ জন প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন বোম্বাই প্রেসিডেন্সির। প্রথম অধিবেশনে বোম্বাই অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
৩০. নরমপন্থী নেতারা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়সসীমা কত করার দাবি জানিয়েছিলেন?
ক) ১৯ বছর থেকে ২৩ বছর খ) ২১ বছর থেকে ২৫ বছর গ) ১৮ বছর থেকে ২১ বছর ঘ) ২৫ বছর থেকে ৩০ বছর
সঠিক উত্তর: ক) ১৯ বছর থেকে ২৩ বছর
ব্যাখ্যা: নরমপন্থী নেতারা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানান। তাঁদের দাবি ছিল, পরীক্ষার সর্বোচ্চ বয়স ১৯ বছর থেকে বাড়িয়ে ২৩ বছর করতে হবে। পাশাপাশি ভারত ও ইংল্যান্ডে একই সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিও তাঁরা তুলেছিলেন।
৩১. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় রাখিবন্ধন উৎসব কে চালু করেন এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিল?
ক) বাল গঙ্গাধর তিলক, হিন্দু ঐক্য প্রতিষ্ঠা খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলা গ) সরলা দেবী চৌধুরানী, বাঙালি বীরত্বের প্রচার ঘ) মহাত্মা গান্ধী, অস্পৃশ্যতা দূর করা
সঠিক উত্তর: খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলা
ব্যাখ্যা: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখিবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি গড়ে তোলা। রাখি পরানোর মাধ্যমে তিনি বাংলার মানুষের মধ্যে একতার বন্ধন দৃঢ় করতে চেয়েছিলেন।
Broad Questions — বড়ো প্রশ্নোত্তর
১. জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি, উদ্দেশ্য ও সেফটি ভালভ তত্ত্ব আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ভারতের শিক্ষিত মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ বাড়তে থাকে। তাঁরা নিজেদের দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরার জন্য একটি সর্বভারতীয় সংগঠনের প্রয়োজন অনুভব করেন। এর ফলেই ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি:
- ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতীয়দের অসন্তোষ বাড়ে।
- শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়।
- ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
- ইলবার্ট বিল বিতর্কের ফলে ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক মনোভাব প্রকাশ পায়।
কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য: ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইয়ে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এতে ৭২ জন প্রতিনিধি যোগ দেন।
কংগ্রেসের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—
- ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা।
- দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা।
- ভারতীয়দের দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরা।
- রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সেফটি ভালভ তত্ত্ব: এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতীয়দের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ যাতে বিদ্রোহের রূপ না নেয়, সেই কারণে ব্রিটিশরা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল। তবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ভারতীয়দের নিজস্ব রাজনৈতিক সচেতনতা ও উদ্যোগও কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ ছিল।
উপসংহার: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতীয়রা নিজেদের দাবি জানানোর জন্য একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ পায়। পরবর্তীকালে এই সংগঠন স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী যুগের কার্যকলাপ, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮৮৫ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত সময়কে জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী যুগ বলা হয়। এই সময়ের প্রধান নেতারা ছিলেন দাদাভাই নওরোজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপালকৃষ্ণ গোখলে ও ফিরোজশাহ মেহতা।
নরমপন্থীদের কার্যকলাপ:
- তাঁরা আবেদন, নিবেদন ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি জানাতেন।
- প্রশাসন ও সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের সুযোগ বাড়ানোর দাবি করেন।
- আইনসভায় ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি জানান।
- ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।
- দেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
সাফল্য:
- ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পায়।
- ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণ সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে।
- ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন পাসের মাধ্যমে আইনসভায় ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব কিছুটা বাড়ে।
- পরবর্তী জাতীয় আন্দোলনের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি হয়।
সীমাবদ্ধতা:
- তাঁদের আন্দোলন মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
- তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের ন্যায়বিচারের ওপর বেশি বিশ্বাস করতেন।
- আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে সব দাবি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
- কৃষক ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ খুব কম ছিল।
- তাঁদের ধীরগতির আন্দোলনে অনেক তরুণ অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন।
উপসংহার: নরমপন্থীদের আন্দোলনে সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাঁরা ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয় ঐক্য বৃদ্ধি পায়।
৩. চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণ ও স্বদেশি আন্দোলনের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদনের নীতিতে অনেক তরুণ নেতা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁরা মনে করতেন, ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে অধিকার আদায় করতে হলে আরও কঠোর আন্দোলন দরকার। এর ফলে কংগ্রেসে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে।
চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণ:
- নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদনের নীতি থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি।
- ব্রিটিশ সরকারের দমনমূলক নীতির ফলে ভারতীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে।
- ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে।
- বিদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ভারতীয় যুবকদের অনুপ্রাণিত করে।
- ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে চরমপন্থী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।
স্বদেশি আন্দোলনে চরমপন্থীদের ভূমিকা:
- বিদেশি পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
- স্বরাজকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
- জাতীয় শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
- সভা, মিছিল ও প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
- ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের কথা বলা হয়।
স্বদেশি আন্দোলনের ফলাফল:
- মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পায়।
- দেশীয় শিল্প ও শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ তৈরি হয়।
- জাতীয় আন্দোলনে ছাত্র ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে।
- কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিরোধ বাড়ে।
- ১৯০৭ সালে সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেসে বিভেদ দেখা দেয়।
উপসংহার: চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ ও স্বদেশি আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন গতি আনে। এর ফলে জাতীয় আন্দোলন আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে।
৪. বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের উত্থানের কারণ, প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো। ক্ষুদিরাম বসু ও অনুশীলন সমিতির ভূমিকা উল্লেখ করো।
ভূমিকা
বিংশ শতকের প্রথম দিকে বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রসার ঘটে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কিছু তরুণ বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেন। বাংলায় এই আন্দোলনে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের উত্থানের কারণ
1. নরমপন্থীদের ব্যর্থতা: কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতারা দীর্ঘদিন আবেদন-নিবেদন করেও বড় কোনো সাফল্য পাননি। এতে অনেক তরুণ হতাশ হয়ে পড়েন।
2. স্বদেশি আন্দোলনের দুর্বলতা: ১৯০৮ সালের পর স্বদেশি আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সরকারের দমন-পীড়নের ফলে অনেক তরুণ সশস্ত্র আন্দোলনের পথে এগিয়ে যান।
3. বঙ্গভঙ্গ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ভারতীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে তরুণদের মধ্যে বিপ্লবী মনোভাবের প্রসার ঘটে।
4. বিদেশি বিপ্লবের প্রভাব: ইতালির মাৎসিনি ও রাশিয়ার বিপ্লবীদের কার্যকলাপ ভারতীয় তরুণদের অনুপ্রাণিত করে।
5. জাতীয়তাবাদী চিন্তা: ভারতের অতীত গৌরব ও স্বাধীনতার ইতিহাস তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের মনোভাব তৈরি করে।
বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য
1. গুপ্ত সমিতি: বিপ্লবীরা অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তরের মতো গোপন সংগঠন তৈরি করেন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে তাঁরা বিপ্লবী কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন।
2. সশস্ত্র সংগ্রাম: ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে যুক্ত কিছু আধিকারিককে লক্ষ্য করে সশস্ত্র আক্রমণের পরিকল্পনা করা হতো।
3. অর্থ সংগ্রহ: অস্ত্র কেনা ও বিপ্লবী কাজ চালানোর জন্য বিপ্লবীরা বিভিন্ন উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। এর মধ্যে বিপ্লবী ডাকাতিও ছিল।
4. বোমা তৈরি: বিপ্লবীরা গোপনে বোমা তৈরি ও অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। কলকাতার মানিকতলায় এমন একটি বোমা তৈরির কেন্দ্র ছিল।
অনুশীলন সমিতির ভূমিকা
১৯০২ সালে সতীশচন্দ্র বসুর উদ্যোগে কলকাতায় অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমিতির উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা।
পরবর্তীকালে এই সমিতির সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা করেন। বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অনুশীলন সমিতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর ভূমিকা
ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী ছিলেন বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের দুই তরুণ বিপ্লবী।
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল তাঁরা মুজাফফরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু ভুলবশত সেই গাড়িতে থাকা দুই ব্রিটিশ মহিলা নিহত হন।
ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেন। ক্ষুদিরাম বসু পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং বিচারে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট তাঁর ফাঁসি হয়।
তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলার তরুণদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তোলে।
বিপ্লবী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
1. বিপ্লবীদের কার্যকলাপ গোপনে পরিচালিত হতো। ফলে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি।
2. অর্থের অভাব এবং ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারির কারণে অনেক বিপ্লবী পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
3. ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো সম্ভব হয়নি।
4. বিপ্লবীদের কার্যকলাপের ফলে ব্রিটিশ সরকার আরও কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে।
5. বিপ্লবীদের মধ্যে বৃহত্তর জনগণকে সংগঠিত করার মতো কর্মসূচি যথেষ্ট ছিল না।
উপসংহার
বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল। যদিও এই আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তবুও বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত করে।
৫. বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি কী ছিল? রাখিবন্ধন উৎসব, বন্দেমাতরম, জাতীয় শিক্ষা ও স্বদেশি শিল্পের ভূমিকা আলোচনা করো।
ভূমিকা
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে শুধু বিদেশি পণ্য বর্জন নয়, দেশীয় সংস্কৃতি, শিক্ষা ও শিল্পের উন্নতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক কর্মসূচি
১. রাখিবন্ধন উৎসব
১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রাখিবন্ধন উৎসবের আয়োজন করেন। এই উৎসবে হিন্দু ও মুসলমান একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে ঐক্যের বার্তা দেন।
রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানটি এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে বাংলার মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
২. বন্দেমাতরম
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি স্বদেশি আন্দোলনের সময় বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এই গান ও স্লোগানের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলা হয়।
৩. শিবাজি ও প্রতাপাদিত্য উৎসব
বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে শিবাজি উৎসবের প্রচলন করেন। অন্যদিকে, সরলা দেবী চৌধুরানী বাংলায় প্রতাপাদিত্য উৎসবের আয়োজন করেন।
এই উৎসবগুলির মাধ্যমে ভারতের অতীত ইতিহাস ও বীরত্বের কথা তুলে ধরে তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানোর চেষ্টা করা হয়।
৪. গান, কবিতা ও মিছিল
স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, নাটক ও মিছিলের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জাতীয় চেতনা ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক কর্মসূচি
১. স্বদেশি পণ্যের ব্যবহার
স্বদেশি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি ছিল দেশীয় পণ্য ব্যবহার করা। বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশীয় কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২. বিদেশি পণ্য বর্জন
বিলিতি কাপড়সহ বিভিন্ন বিদেশি পণ্য বর্জনের জন্য আন্দোলন করা হয়। অনেক জায়গায় বিদেশি কাপড় পোড়ানো হয় এবং মানুষকে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়।
৩. স্বদেশি শিল্পের প্রতিষ্ঠা
এই সময়ে দেশীয় শিল্পের উন্নতির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালস, দেশীয় সাবান, দেশলাই ও কাপড়ের কারখানার মতো উদ্যোগগুলি স্বদেশি শিল্পের প্রসারে সাহায্য করে।
৪. জাতীয় শিক্ষা
স্বদেশি আন্দোলনের সময় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজসহ বিভিন্ন জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গেও এই জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সম্পর্ক রয়েছে।
স্বদেশি আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
1. দেশীয় পণ্যের দাম অনেক সময় বেশি হওয়ায় দরিদ্র মানুষের পক্ষে সেগুলি কেনা কঠিন ছিল।
2. দেশীয় শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত মূলধন ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ছিল।
3. আন্দোলনের নেতৃত্ব মূলত শিক্ষিত শহুরে মানুষের হাতে ছিল।
4. ধর্মীয় প্রতীকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে কিছু মুসলমান আন্দোলন থেকে দূরে সরে যান।
উপসংহার
স্বদেশি আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় ঐক্যের ভাবনা ছড়িয়ে দেয়। এই আন্দোলন দেশীয় শিল্প ও জাতীয় শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬. বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) কী? এর সরকারি যুক্তি ও প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ধারা ও চূড়ান্ত ফলাফল আলোচনা করো।
ভূমিকা
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বড়োলাট লর্ড কার্জনের আমলে বাংলা প্রদেশকে ভাগ করা হয়। এই ঘটনাই বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলায় ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলনে পরিণত হয়।
বঙ্গভঙ্গের পরিচয়
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলা প্রদেশকে দুটি ভাগে ভাগ করে।
প্রথম ভাগে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। এর রাজধানী ছিল ঢাকা।
দ্বিতীয় ভাগে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিহার ও উড়িষ্যাকে রাখা হয়। এর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল কলকাতা।
বঙ্গভঙ্গের সরকারি যুক্তি
ব্রিটিশ সরকারের মতে, বাংলার জনসংখ্যা ও আয়তন অনেক বেশি হওয়ায় প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করতে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা ভাগ করা হয়।
বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত উদ্দেশ্য
ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতাদের মতে, বঙ্গভঙ্গের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
তখন বাংলা ছিল ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই বাংলাকে ভাগ করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ব্রিটিশ সরকার জাতীয় আন্দোলনের শক্তি কমাতে চেয়েছিল বলে জাতীয়তাবাদী নেতারা মনে করতেন।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ধারা
১. প্রতিবাদ ও শোক দিবস পালন
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন বাংলার বিভিন্ন স্থানে শোক দিবস পালন করা হয়। সভা, মিছিল ও প্রতিবাদের মাধ্যমে মানুষ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন।
২. রাখিবন্ধন উৎসব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য বজায় রাখার জন্য রাখিবন্ধন উৎসবের আয়োজন করেন। এর মাধ্যমে বাংলার মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
৩. স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন
আন্দোলনকারীরা বিদেশি পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এর ফলে স্বদেশি আন্দোলনের প্রসার ঘটে।
৪. জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন
ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫. আন্দোলনের প্রসার
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে বাংলার বাইরে অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে নতুন গতি আসে।
বঙ্গভঙ্গের চূড়ান্ত ফলাফল
1. বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলনের প্রসার ঘটে।
2. দেশীয় শিল্প ও জাতীয় শিক্ষার উন্নতির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
3. কংগ্রেসে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিরোধ বাড়ে।
4. বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের প্রসার ঘটে।
5. দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা করে।
6. একই সময়ে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উপসংহার
বঙ্গভঙ্গ ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর প্রতিবাদে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের প্রসার ঘটে এবং ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনা আরও শক্তিশালী হয়।
৭. নরমপন্থী ও চরমপন্থী— কংগ্রেসের এই দুই ধারার মধ্যে আদর্শ, কৌশল ও লক্ষ্যের পার্থক্য কী ছিল? সুরাট অধিবেশন (১৯০৭) ও কংগ্রেস ভাঙনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করো।
ভূমিকা
১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে নরমপন্থী নেতাদের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁদের আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে চরমপন্থী নেতৃত্বের উত্থান ঘটে।
নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে পার্থক্য
| বিষয় | নরমপন্থী | চরমপন্থী |
|---|---|---|
| সময়কাল | ১৮৮৫-১৯০৫ | বিশেষ করে ১৯০৫-১৯২০ |
| লক্ষ্য | ব্রিটিশ শাসনের অধীনে সংস্কার ও স্বায়ত্তশাসন | স্বরাজ প্রতিষ্ঠা |
| আন্দোলনের পদ্ধতি | আবেদন, নিবেদন ও স্মারকলিপি | স্বদেশি, বয়কট ও গণআন্দোলন |
| ব্রিটিশ শাসনের প্রতি মনোভাব | ব্রিটিশ সরকারের কাছে সংস্কারের আশা | ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা |
| প্রধান নেতা | দাদাভাই নওরোজি, গোখলে, সুরেন্দ্রনাথ | তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায় |
| সামাজিক ভিত্তি | শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত | ছাত্র, যুবক ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে সমর্থন |
| প্রধান কর্মসূচি | সাংবিধানিক পদ্ধতিতে দাবি আদায় | স্বদেশি, বয়কট, জাতীয় শিক্ষা ও নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ |
নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিরোধের কারণ
1. নরমপন্থীরা আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার আদায় করতে চেয়েছিলেন। চরমপন্থীরা এই পদ্ধতিকে যথেষ্ট মনে করতেন না।
2. নরমপন্থীরা ব্রিটিশ সরকারের ওপর তুলনামূলকভাবে আস্থা রাখতেন। চরমপন্থীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতেন।
3. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে দুই দলের মধ্যে বিরোধ আরও বেড়ে যায়।
4. ১৯০৬ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে স্বরাজ, স্বদেশি, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষার কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য থেকে যায়।
সুরাট অধিবেশন (১৯০৭)
১৯০৭ সালে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন সুরাটে অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিরোধ চরমে ওঠে।
সভাপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। নরমপন্থীরা রাসবিহারী ঘোষকে সভাপতি করতে চান। অন্যদিকে চরমপন্থীদের সঙ্গে সভাপতি নির্বাচন ও আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
অধিবেশনে হট্টগোল শুরু হলে দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে ভাঙন দেখা দেয়।
নরমপন্থীরা কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে রাখেন। অন্যদিকে চরমপন্থীরা কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
কংগ্রেস ভাঙনের ফলাফল
1. কংগ্রেসের মধ্যে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়।
2. জাতীয় আন্দোলনের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
3. ব্রিটিশ সরকার এই বিভেদের সুযোগ পায়।
4. পরবর্তী সময়ে দুই দলের মধ্যে পুনরায় ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
উপসংহার
নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে লক্ষ্য ও আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে পার্থক্য থাকলেও উভয় পক্ষই ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিল। ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে তাঁদের বিরোধের ফলে কংগ্রেসে ভাঙন দেখা দেয়।
৮. স্বদেশি আন্দোলনকে কেন ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম গণআন্দোলন’ বলা হয়? এর সাফল্য ও ব্যর্থতার নিরিখে বক্তব্য রাখো।
ভূমিকা
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে নতুন কর্মসূচি ও আন্দোলনের পদ্ধতি যুক্ত হয়।
স্বদেশি আন্দোলনকে প্রথম গণআন্দোলন বলার কারণ
১. সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
নরমপন্থী যুগে কংগ্রেসের আন্দোলন মূলত শিক্ষিত শহুরে মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনে ছাত্র, যুবক, নারী ও মধ্যবিত্ত মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে। কিছু অঞ্চলে কৃষকরাও আন্দোলনে যুক্ত হন।
২. সাংস্কৃতিক কর্মসূচি
রাখিবন্ধন উৎসব, বন্দেমাতরম গান, দেশাত্মবোধক কবিতা, নাটক ও মিছিলের মাধ্যমে আন্দোলন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. অর্থনৈতিক কর্মসূচি
স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশীয় পণ্য ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদেশি পণ্য বর্জনের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের উন্নতির চেষ্টা করা হয়।
৪. জাতীয় শিক্ষা
সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় শিক্ষার প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
৫. সর্বভারতীয় প্রভাব
স্বদেশি আন্দোলন বাংলার বাইরে বোম্বাই, মাদ্রাজ ও পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে জাতীয় আন্দোলনের পরিধি বাড়ে।
স্বদেশি আন্দোলনের সাফল্য
1. বঙ্গভঙ্গ রদ: দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করে।
2. দেশীয় শিল্পের উন্নতি: দেশীয় পণ্য ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন স্বদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
3. জাতীয় শিক্ষার প্রসার: জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
4. জাতীয় চেতনার বিকাশ: স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের ভাবনা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
5. পরবর্তী আন্দোলনের ভিত্তি: স্বদেশি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বদেশি আন্দোলনের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা
1. সীমিত জনসমর্থন: আন্দোলনের নেতৃত্ব মূলত শিক্ষিত শহুরে মানুষের হাতে ছিল। ফলে অধিকাংশ কৃষক ও শ্রমিককে দীর্ঘদিন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
2. দেশীয় পণ্যের বেশি দাম: স্বদেশি পণ্যের দাম অনেক সময় বেশি হওয়ায় দরিদ্র মানুষের পক্ষে সেগুলি কেনা কঠিন ছিল।
3. সাম্প্রদায়িক বিভেদ: আন্দোলনে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার বাড়ায় অনেক মুসলমান আন্দোলন থেকে দূরে সরে যান।
4. নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ: নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে মতবিরোধের ফলে আন্দোলনের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
5. সরকারি দমননীতি: ব্রিটিশ সরকারের দমন-পীড়নের ফলে ১৯০৮ সালের পর আন্দোলনের গতি কমে যায়।
উপসংহার
স্বদেশি আন্দোলন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশীয় শিল্প, জাতীয় শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতার প্রসার ঘটে। তবে জনসাধারণের সীমিত অংশগ্রহণ, সাম্প্রদায়িক বিভেদ এবং নেতৃত্বের মতবিরোধের কারণে আন্দোলন দীর্ঘদিন একইভাবে চলতে পারেনি।
পরীক্ষার আগে একবার দেখে নেবে
গুরুত্বপূর্ণ সাল ও ঘটনা
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৮৩৬ | বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা |
| ১৮৩৮ | জমিদার সভা |
| ১৮৬৭ | হিন্দু মেলা |
| ১৮৭৫ | ইন্ডিয়ান লিগ |
| ১৮৭৬ | ভারতসভা |
| ১৮৮৩ | ইলবার্ট বিল বিতর্ক |
| ১৮৮৫ | ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা |
| ১৯০২ | অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা |
| ১৯০৫ | বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলন |
| ১৯০৬ | কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশন |
| ১৯০৭ | সুরাটে কংগ্রেস বিভাজন |
| ১৯০৮ | ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর অভিযান |
| ১৯০৯ | মর্লে-মিন্টো সংস্কার |
| ১৯১১ | বঙ্গভঙ্গ রদ |
পরীক্ষার জন্য মনে রাখবে
- নরমপন্থী: আবেদন-নিবেদন ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ।
- চরমপন্থী: স্বরাজ, স্বদেশি, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষা।
- বঙ্গভঙ্গ: লর্ড কার্জন, ১৯০৫।
- সুরাট বিভাজন: নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিরোধ, ১৯০৭।
- মর্লে-মিন্টো সংস্কার: ১৯০৯ সালে পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা।
- বিপ্লবী আন্দোলন: অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী।