class 8 history question and answer chapter 1

WBBSE Class 8 History Chapter 1 ইতিহাসের ধারণা Question Answers

ইতিহাস হলো অতীতের মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির ধারাবাহিক বিবরণ। অতীতের বিভিন্ন ঘটনা ও তার কারণ বিশ্লেষণ করে আমরা বর্তমানকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়া বা যুদ্ধের কাহিনি নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সমাজের পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরে। তাই ইতিহাস আমাদের অতীত সম্পর্কে জ্ঞান দেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে সাহায্য করে।

Class 8 History MCQ Questions and Answers in Bengali

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (২৫টি)

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচলিত ভারতীয় ইতিহাসকে কী বলে বর্ণনা করেছিলেন?

ক) গৌরবময় ইতিহাস
খ) দুঃস্বপ্নকাহিনী
গ) বীরদের জীবনকাহিনী
ঘ) স্বাধীনতার কাহিনী

সঠিক উত্তর: খ) দুঃস্বপ্নকাহিনী

ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, ইতিহাসে শুধু রাজাদের শাসন, যুদ্ধ এবং রাজস্বের হিসাব থাকলে সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে জানা যায় না। এই ধরনের ইতিহাস পড়ে অনেক সময় শুধু তথ্য মুখস্থ করতে হয়। তাই তিনি প্রচলিত ইতিহাসের এই একপেশে ধারাকে দুঃস্বপ্নকাহিনী বলে উল্লেখ করেছিলেন।

২. ইতিহাস অধ্যয়ন করলে আমাদের কী লাভ হয়?

ক) শুধু অতীতের ঘটনা জানা যায়
খ) বর্তমানকে বুঝতে এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে সাহায্য করে
গ) কেবল রাজা-বাদশাদের পরিচয় পাওয়া যায়
ঘ) শুধুমাত্র পুরোনো দিনের গল্প জানা যায়

সঠিক উত্তর: খ) বর্তমানকে বুঝতে এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে সাহায্য করে

ব্যাখ্যা: বর্তমান সমাজের অনেক ঘটনা ও সমস্যার শিকড় অতীতের মধ্যে রয়েছে। ইতিহাস পড়লে সেই ঘটনাগুলির পেছনের কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অতীতের সাফল্য ও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়। তাই ইতিহাসের গুরুত্ব শুধু অতীত জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

৩. জেমস মিলের The History of British India বইটি কোন সালে প্রকাশিত হয়?

ক) ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে

সঠিক উত্তর: খ) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে

ব্যাখ্যা: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে জেমস মিল The History of British India নামে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি ভারতের ইতিহাসকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ব্রিটিশ কর্মচারীরা যাতে ভারত সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন, সেটিও বইটি লেখার একটি উদ্দেশ্য ছিল।

৪. জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে কয়টি যুগে ভাগ করেছিলেন?

ক) দুটি
খ) তিনটি
গ) চারটি
ঘ) পাঁচটি

সঠিক উত্তর: খ) তিনটি

ব্যাখ্যা: জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। সেগুলি হলো—হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ এবং ব্রিটিশ যুগ। প্রথম দুটি যুগের নামকরণ করা হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। আর শেষের যুগটির নাম রাখা হয়েছিল শাসক ব্রিটিশদের পরিচয় অনুসারে।

৫. জেমস মিলের যুগবিভাগের প্রধান সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

ক) প্রতিটি যুগের সময়সীমা খুব ছোট ছিল
খ) ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন শাসককে একই যুগে রাখা হয়েছিল
গ) ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ পড়েছিল
ঘ) সব যুগের নাম একই ছিল

সঠিক উত্তর: খ) ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন শাসককে একই যুগে রাখা হয়েছিল

ব্যাখ্যা: জেমস মিল ভারতের ইতিহাস ভাগ করার সময় শাসকদের ধর্মকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু একই ধর্মের সব শাসকের শাসনব্যবস্থা বা চিন্তাধারা একরকম ছিল না। উদাহরণ হিসেবে, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী সম্রাট অশোককেও হিন্দু যুগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে এই যুগবিভাগে ভারতের ইতিহাসের নানা বৈচিত্র্য যথাযথভাবে প্রকাশ পায়নি।

৬. ইতিহাসের প্রচলিত পাঠ্যধারা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আপত্তি কী ছিল?

ক) রাজা, যুদ্ধ ও রাজস্বের বিবরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া
খ) সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে আলোচনা করা
গ) সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তন তুলে ধরা
ঘ) কৃষক ও শ্রমিকদের জীবন সম্পর্কে লেখা

সঠিক উত্তর: ক) রাজা, যুদ্ধ ও রাজস্বের বিবরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া

ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, ইতিহাসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজ ও সংস্কৃতির কথাও থাকা দরকার। শুধু রাজাদের যুদ্ধ বা শাসনের বিবরণ পড়ে একটি দেশের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা যায় না। তাই ইতিহাসের পাঠে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও জীবনের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

৭. ‘রাজাবলি’ গ্রন্থটি কে রচনা করেছিলেন?

ক) জেমস মিল
খ) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) উইলিয়ম ওয়েভারবার্ন

সঠিক উত্তর: খ) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার

ব্যাখ্যা: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজাবলি’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইয়ে প্রাচীন রাজাদের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছিল। যুধিষ্ঠিরের সময় থেকে কলিযুগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এতে ইতিহাসের পাশাপাশি পৌরাণিক ও অতিপ্রাকৃত কাহিনিও স্থান পেয়েছিল।

৮. ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের লেখা ইতিহাসের বিকল্প হিসেবে ভারতীয়রা কী করতে চেয়েছিলেন?

ক) শুধু মোগল শাসনের ইতিহাস লিখতে
খ) শুধু মারাঠা শাসনের ইতিহাস লিখতে
গ) ভারতীয়দের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশের ইতিহাস রচনা করতে
ঘ) ফরাসি শাসনের ইতিহাস লিখতে

সঠিক উত্তর: গ) ভারতীয়দের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশের ইতিহাস রচনা করতে

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের লেখায় অনেক সময় ভারতের অতীতকে ব্রিটিশদের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করা হতো। এর জবাবে ভারতীয় শিক্ষিত ব্যক্তিরা নিজেদের দেশের ইতিহাস নিজেরা লেখার উদ্যোগ নেন। তাঁরা ভারতের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অতীতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর ফলে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার বিকাশ ঘটে।

৯. সাম্রাজ্যবাদ বলতে কী বোঝায়?

ক) স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা
খ) একটি শক্তিশালী দেশের অন্য দেশের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা
গ) গণতান্ত্রিক শাসন চালু করা
ঘ) বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি করা

সঠিক উত্তর: খ) একটি শক্তিশালী দেশের অন্য দেশের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা

ব্যাখ্যা: কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন অন্য একটি দেশের ওপর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে, তখন তাকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। এর ফলে অধীনস্থ দেশটি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা হারাতে পারে। শাসক দেশটি নিজের স্বার্থে সেই দেশের সম্পদ ও প্রশাসন ব্যবহার করতে পারে।

১০. উপনিবেশবাদ বলতে কী বোঝায়?

ক) নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন পরিচালনা করা
খ) অন্য দেশের অঞ্চল, মানুষ ও সম্পদকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা
গ) রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা
ঘ) সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা

সঠিক উত্তর: খ) অন্য দেশের অঞ্চল, মানুষ ও সম্পদকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা

ব্যাখ্যা: কোনো শক্তিশালী দেশ অন্য একটি অঞ্চল দখল করে সেখানকার মানুষ ও সম্পদকে নিজেদের দেশের স্বার্থে কাজে লাগালে তাকে উপনিবেশবাদ বলা হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারত থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে ব্রিটেনের শিল্পে ব্যবহার করা হতো। বাংলায় নীল চাষের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক স্বার্থ কাজ করেছিল।

১১. ইতিহাস রচনার জন্য ইতিহাসবিদরা কোন কোন উপাদান ব্যবহার করেন?

ক) কেবল বই
খ) চিঠি, ডায়েরি, সরকারি নথি, ছবি, মানচিত্র ও সংবাদপত্র
গ) শুধু সংবাদপত্র
ঘ) শুধুমাত্র সরকারি দলিল

সঠিক উত্তর: খ) চিঠি, ডায়েরি, সরকারি নথি, ছবি, মানচিত্র ও সংবাদপত্র

ব্যাখ্যা: অতীতের ঘটনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে ইতিহাসবিদরা নানা ধরনের উপাদানের সাহায্য নেন। পুরোনো চিঠি, ব্যক্তিগত ডায়েরি, সরকারি নথি, জমির দলিল, ছবি, মানচিত্র ও সংবাদপত্র তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের তুলনা করে ইতিহাসবিদরা অতীতের ঘটনা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন।

১২. আধুনিক যুগের ইতিহাস রচনার জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপাদান পাওয়া যায় কেন?

ক) এই যুগে যুদ্ধের সংখ্যা বেশি ছিল
খ) এই সময়ের অনেক নথি, চিঠি ও ছবি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে
গ) সেই সময়ের প্রত্যেক মানুষ শিক্ষিত ছিলেন
ঘ) এই যুগের কোনো উপাদান নষ্ট হয়নি

সঠিক উত্তর: খ) এই সময়ের অনেক নথি, চিঠি ও ছবি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে

ব্যাখ্যা: আধুনিক যুগ প্রাচীন যুগের তুলনায় অনেক বেশি সাম্প্রতিক। তাই এই সময়ের বহু সরকারি নথি, চিঠিপত্র, বই ও ছবি এখনও পাওয়া যায়। বর্তমানে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পুরোনো নথি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এই কারণেই আধুনিক যুগের ইতিহাস লেখার জন্য নানা ধরনের উপাদান ব্যবহার করা যায়।

১৩. ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়?

ক) দুটি সম্পূর্ণ আলাদা দেশের ইতিহাস
খ) একটি ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং অন্যটি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা
গ) একটি প্রাচীন যুগের, অন্যটি আধুনিক যুগের
ঘ) একটি হিন্দু শাসকদের, অন্যটি মুসলিম শাসকদের ইতিহাস

সঠিক উত্তর: খ) একটি ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং অন্যটি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা

ব্যাখ্যা: ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থের প্রভাব দেখা যায়। অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে ভারতীয়দের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশের অতীত ও ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। ব্রিটিশদের লেখা ইতিহাসের বিভিন্ন ব্যাখ্যার জবাব দিতেও ভারতীয় ঐতিহাসিকরা নিজেদের ইতিহাস রচনায় উদ্যোগী হয়েছিলেন।

১৪. ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের ছবি থেকে কোন বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা যায় না?

ক) গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুর কথোপকথনের বিষয়
খ) তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য
গ) অধিবেশনের স্থান
ঘ) অধিবেশনে উপস্থিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি

সঠিক উত্তর: খ) তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য

ব্যাখ্যা: হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের ছবিতে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুকে একসঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু একটি ছবি দেখে তাঁদের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণ বা বিষয়বস্তু বোঝা সম্ভব নয়। ছবি থেকে মূলত দৃশ্যমান বিষয়গুলিই জানা যায়। কোনো ঐতিহাসিক ছবি সঠিকভাবে বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিবরণও পড়তে হয়।

১৫. ইতিহাসকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে ভাগ করার ক্ষেত্রে কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?

ক) যুগগুলির নাম বোঝা কঠিন
খ) এই বিভাজন সব অঞ্চল ও সব ঘটনার ক্ষেত্রে সমানভাবে খাটে না
গ) কোনো যুগেরই নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই
ঘ) ইতিহাসের বইয়ের আকার বেড়ে যায়

সঠিক উত্তর: খ) এই বিভাজন সব অঞ্চল ও সব ঘটনার ক্ষেত্রে সমানভাবে খাটে না

ব্যাখ্যা: প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক—এই তিন ভাগে ইতিহাসকে সাজালে পড়াশোনা সহজ হয়। কিন্তু সব অঞ্চলে একই সময়ে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেনি। একটি যুগ থেকে অন্য যুগে পরিবর্তনও একদিনে হয় না। তাই এই যুগবিভাগ ব্যবহার করার সময় তার সীমাবদ্ধতার কথাও মনে রাখা দরকার।

১৬. ভারতের কোন ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে এখনও বিভিন্ন মত ও বিতর্ক রয়েছে?

ক) কলিঙ্গ যুদ্ধ
খ) পলাশির যুদ্ধ
গ) ১৯৪৭ সালের দেশভাগ
ঘ) প্রথম পানিপথের যুদ্ধ

সঠিক উত্তর: গ) ১৯৪৭ সালের দেশভাগ

ব্যাখ্যা: ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দেশভাগ ঘটে। দেশভাগের কারণ, এর জন্য কারা দায়ী এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী ছিল—এই বিষয়গুলি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। দেশভাগের ফলে বহু মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। তাই এই ঘটনা নিয়ে ইতিহাসবিদদের আলোচনা ও গবেষণা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

১৭. কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা অনেক পুরোনো হয়ে গেলে সেই ঘটনা নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন ঘটতে পারে?

ক) বিতর্কের গুরুত্ব কমে যেতে পারে
খ) বিতর্ক সব সময় বাড়তে থাকে
গ) সেই ঘটনার সমস্ত তথ্য হারিয়ে যায়
ঘ) মানুষ ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভুলে যায়

সঠিক উত্তর: ক) বিতর্কের গুরুত্ব কমে যেতে পারে

ব্যাখ্যা: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সেই ঘটনা নিয়ে বিতর্কের ধরন বদলাতে পারে। বর্তমান সমাজের সঙ্গে ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক কমে গেলে বিতর্কের গুরুত্বও অনেক সময় কমে যায়। তবে পুরোনো ঘটনা নিয়ে গবেষণা বন্ধ হয়ে যায় না। ইতিহাসবিদরা নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সেগুলি নিয়েও আলোচনা করেন।

১৮. ‘আধুনিক’ শব্দটির উৎপত্তি কোন শব্দ থেকে হয়েছে?

ক) আধুনিকতা
খ) অধুনা
গ) আধুনিকীকরণ
ঘ) অধিকার

সঠিক উত্তর: খ) অধুনা

ব্যাখ্যা: ‘আধুনিক’ শব্দটি ‘অধুনা’ শব্দ থেকে এসেছে। ‘অধুনা’ শব্দের অর্থ বর্তমানে বা সম্প্রতি। সেই অর্থ থেকেই আধুনিক শব্দের ব্যবহার হয়েছে। তবে ইতিহাসে আধুনিক যুগের শুরু ঠিক কোন সময় থেকে, তা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

১৯. ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্পের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন দিকটি বোঝানো হয়েছে?

ক) ইতিহাসের সাহায্যে যুক্তি ও প্রমাণ দেওয়া যায়
খ) ইতিহাস কেবল মুখস্থ করার বিষয়
গ) ইতিহাস মানেই গল্পের বই
ঘ) পশুদের ইতিহাস জানা সবচেয়ে জরুরি

সঠিক উত্তর: ক) ইতিহাসের সাহায্যে যুক্তি ও প্রমাণ দেওয়া যায়

ব্যাখ্যা: ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্পে নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে অতীতের ঘটনা তুলে ধরে যুক্তি দেওয়ার বিষয়টি দেখা যায়। এই গল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়, ইতিহাসের তথ্য কোনো বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেও কোনো ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

২০. ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য ব্রিটিশরা কী যুক্তি দিত?

ক) ভারতের সম্পদ রক্ষা করা তাদের কর্তব্য ছিল
খ) ভারতীয়দের অসভ্য বলে দাবি করে তাদের সভ্য করার কথা বলত
গ) ভারতীয় রাজারা তাদের শাসন করতে অনুরোধ করেছিলেন
ঘ) তারা শুধু ব্যবসা করার জন্য ভারতে এসেছিল

সঠিক উত্তর: খ) ভারতীয়দের অসভ্য বলে দাবি করে তাদের সভ্য করার কথা বলত

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ শাসকরা নিজেদের সভ্য ও উন্নত বলে প্রচার করত। একই সঙ্গে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিকে পিছিয়ে পড়া বলে দেখানোর চেষ্টা করত। তারা দাবি করত, ভারতীয়দের উন্নতির জন্য ব্রিটিশ শাসন প্রয়োজন। এই ধরনের যুক্তি দেখিয়ে তারা ভারতে নিজেদের শাসনকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

২১. ভারতীয় সভ্যতাকে পিছিয়ে পড়া বলে ব্রিটিশরা যে ধারণা প্রচার করেছিল, তার জবাবে ভারতীয়রা কী করেছিল?

ক) শুধু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল
খ) ভারতের প্রাচীন সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার নিদর্শন তুলে ধরেছিল
গ) দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল
ঘ) ব্রিটিশদের সব বক্তব্য মেনে নিয়েছিল

সঠিক উত্তর: খ) ভারতের প্রাচীন সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার নিদর্শন তুলে ধরেছিল

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশদের নেতিবাচক ধারণার বিরোধিতা করতে ভারতীয় শিক্ষিত ব্যক্তিরা দেশের প্রাচীন সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁরা অশোক, আর্যভট্ট ও চৈতন্যদেবের মতো ব্যক্তিত্বদের অবদান স্মরণ করিয়ে দেন। এর মাধ্যমে ভারতের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরা হয়।

২২. সাঁওতাল বিদ্রোহে অংশ নেওয়া বহু সাধারণ মানুষের নাম ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়নি কেন?

ক) বিদ্রোহে তাঁদের কোনো ভূমিকা ছিল না
খ) তাঁদের নামের বদলে অনেক সময় অংশগ্রহণকারীদের মোট সংখ্যা দেওয়া হয়েছে
গ) তাঁরা সবাই অন্য দেশে চলে গিয়েছিলেন
ঘ) তাঁদের নাম লেখার কোনো প্রয়োজন ছিল না

সঠিক উত্তর: খ) তাঁদের নামের বদলে অনেক সময় অংশগ্রহণকারীদের মোট সংখ্যা দেওয়া হয়েছে

ব্যাখ্যা: সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে সিধু ও কানহুর নাম বিশেষভাবে পরিচিত। কিন্তু এই বিদ্রোহে অংশ নেওয়া বহু সাধারণ মানুষের নাম আজও অজানা। ইতিহাসের বইয়ে অনেক সময় আন্দোলনের নেতাদের পরিচয় বেশি গুরুত্ব পায়, অথচ সাধারণ মানুষের অবদান ও ব্যক্তিগত পরিচয় বিস্তারিতভাবে লেখা হয় না। ফলে তাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

২৩. ইতিহাস পড়ার সময় কোন বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা বিশেষ জরুরি?

ক) রাজা-বাদশাদের নাম মুখস্থ করা
খ) একই ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন মত ও ব্যাখ্যা জানা
গ) শুধু সাল-তারিখ মনে রাখা
ঘ) শুধুমাত্র পুরোনো ছবি দেখা

সঠিক উত্তর: খ) একই ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন মত ও ব্যাখ্যা জানা

ব্যাখ্যা: একই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদের আলাদা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তাঁরা বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিজেদের মত প্রকাশ করেন। তাই শুধু একটি ব্যাখ্যা মুখস্থ না করে অন্য মতগুলিও জানা দরকার। তথ্য ও যুক্তির সাহায্যে সেগুলি বিচার করলে ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।

২৪. বিপিনচন্দ্র পালের মতে, বাংলার ইতিহাস কারা রচনা করবেন?

ক) ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা
খ) বাঙালিরা নিজেরাই
গ) আমেরিকান ঐতিহাসিকরা
ঘ) ফরাসি ঐতিহাসিকরা

সঠিক উত্তর: খ) বাঙালিরা নিজেরাই

ব্যাখ্যা: বিপিনচন্দ্র পাল মনে করতেন, বাংলার ইতিহাস লেখার দায়িত্ব বাঙালিদের নিজেদেরই নেওয়া উচিত। বাংলার মানুষ, সমাজ ও অতীত সম্পর্কে বাঙালিদের আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসা দরকার। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, যোগ্যতা ও আগ্রহ থাকলে যে কেউ বাংলার ইতিহাস রচনায় অংশ নিতে পারেন।

২৫. লর্ড ওয়াভেল ও লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের কোন ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত?

ক) পলাশির যুদ্ধ
খ) ১৯৪৭ সালের দেশভাগ
গ) ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ
ঘ) ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ

সঠিক উত্তর: খ) ১৯৪৭ সালের দেশভাগ

ব্যাখ্যা: লর্ড ওয়াভেল ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন। তাঁর পরে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৪৭ সালে তাঁর শাসনকালেই ভারত স্বাধীন হয় এবং দেশভাগ ঘটে। তাই ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগের ইতিহাসে এই দুই ভাইসরয়ের নাম গুরুত্বপূর্ণ।


Class 8 History SAQ Questions and Answers in Bengali

নবম শ্রেণির ইতিহাস – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১৮টি)

১. ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাস পড়ার দরকার কেন?

উত্তর: মানুষের অতীত জীবন, সমাজ, শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিবরণকে ইতিহাস বলা হয়। ইতিহাস পড়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, অতীতে কী কী ঘটনা ঘটেছিল এবং সেগুলি কীভাবে বর্তমান সমাজকে প্রভাবিত করেছে।

ইতিহাস পড়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা হলো—

১. অতীতের ঘটনাগুলির সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক বোঝা যায়।
২. বিভিন্ন ঘটনার কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।
৩. অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়া যায়।
৪. নিজের দেশ, সমাজ ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়।
৫. সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের ধারাটি বুঝতে সুবিধা হয়।

২. ভারতের প্রচলিত ইতিহাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য কী ছিল?

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধে প্রচলিত ইতিহাস শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ইতিহাসের পাঠে রাজা, যুদ্ধ ও রাজস্বের হিসাবের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবনযাত্রা ও সমাজের নানা দিক আড়ালে থেকে যায়।

তিনি মনে করতেন, ইতিহাসকে শুধু শাসকদের কাহিনির মধ্যে আটকে রাখলে দেশের প্রকৃত অতীত জানা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের জীবন, চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতিকেও ইতিহাসের আলোচনায় স্থান দেওয়া দরকার।

৩. জেমস মিলের ভারতের ইতিহাসের যুগবিভাগ কী ছিল? এই বিভাজনের ত্রুটিগুলি লেখো।

উত্তর: ১৮১৭ সালে প্রকাশিত The History of British India গ্রন্থে জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। এগুলি হলো—

১. হিন্দু যুগ
২. মুসলিম যুগ
৩. ব্রিটিশ যুগ

এই বিভাজনের কয়েকটি সমস্যা ছিল। প্রথমত, শাসকদের ধর্মের ভিত্তিতে যুগের নাম দেওয়ায় একই যুগের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপেক্ষিত হয়। যেমন, জৈন ধর্ম গ্রহণকারী চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অশোকও হিন্দু যুগের অন্তর্ভুক্ত হন।

দ্বিতীয়ত, ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসকে মাত্র তিনটি ভাগে সীমাবদ্ধ করায় বিভিন্ন অঞ্চলের আলাদা ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়নি। পরবর্তীকালে এই যুগবিভাগের পরিবর্তে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ধারণা প্রচলিত হয়।

৪. প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে ইতিহাস ভাগ করার অসুবিধা কী? উদাহরণসহ লেখো।

উত্তর: ইতিহাসকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক—এই তিন ভাগে ভাগ করলে পড়াশোনা সহজ হয়। কিন্তু এই বিভাজন সব সময় অতীতের প্রকৃত পরিবর্তনকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে না। কারণ, একটি যুগ শেষ হয়ে অন্য যুগ শুরু হলেও সমাজ ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয় ১৭০৭ সালে। তাঁকে মধ্যযুগের শাসক হিসেবে ধরা হয়। অথচ তার মাত্র ৫০ বছর পর, ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধকে আধুনিক যুগের ঘটনা বলা হয়। কিন্তু বাংলার নবাবি শাসনে মোগল প্রশাসনের অনেক ধারাই তখনও বজায় ছিল।

আবার সুলতান রাজিয়া ১২৩৬ থেকে ১২৪০ সাল পর্যন্ত দিল্লি শাসন করেছিলেন। নারী শাসক হিসেবে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সময়ের হিসাবে তাঁকে মধ্যযুগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই শুধু সময়ের ভিত্তিতে যুগ নির্ধারণ করলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়।

৫. সাম্রাজ্যবাদ কী? উপনিবেশবাদের সঙ্গে এর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন অন্য একটি দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন সেই আধিপত্য বিস্তারের নীতিকে সাম্রাজ্যবাদ বলে।

উপনিবেশবাদ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কোনো দেশ অন্য দেশের অঞ্চল দখল করে সেখানকার মানুষ ও সম্পদকে নিজের দেশের প্রয়োজনে ব্যবহার করলে তাকে উপনিবেশবাদ বলা হয়।

ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত ছিল এর একটি উদাহরণ। বাংলায় নীল চাষের মাধ্যমে ব্রিটিশরা নিজেদের বস্ত্রশিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করত। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যশস্য চাষের জমি কমে যেত এবং কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ত। এই ঘটনা উপনিবেশবাদের অর্থনৈতিক দিকটি বুঝতে সাহায্য করে।

৬. ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মধ্যে কী বিরোধ ছিল?

উত্তর: ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। জেমস মিলের মতো ঐতিহাসিকদের লেখায় ভারতীয় সমাজকে অনেক সময় পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখানো হয়। এই ধরনের ইতিহাসের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় বলে তুলে ধরা হতো।

এর প্রতিবাদে ভারতীয় শিক্ষিত সমাজ নিজেদের দেশের অতীত নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতির নানা উদাহরণ তুলে ধরেন। অশোক, আর্যভট্ট ও চৈতন্যদেবের মতো ব্যক্তিত্বদের অবদানও আলোচনায় আসে।

এইভাবে ভারতীয়দের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস লেখার যে ধারা তৈরি হয়, তা জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নামে পরিচিত। সিরাজ-উদ-দৌলার মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টাও এই ইতিহাসচর্চার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

৭. ইতিহাসের উপাদান কী? আধুনিক যুগের ইতিহাস লেখার জন্য কী কী উপাদান পাওয়া যায়?

উত্তর: অতীতের ঘটনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং সেই সময়ের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির চিত্র পুনর্গঠনের জন্য ইতিহাসবিদরা যেসব নথি, দলিল ও নিদর্শন ব্যবহার করেন, সেগুলিকে ইতিহাসের উপাদান বলা হয়।

আধুনিক যুগের ইতিহাস লেখার জন্য নানা ধরনের উপাদান পাওয়া যায়। যেমন—

১. সরকারি দপ্তরের নথি ও প্রশাসনিক কাগজপত্র।
২. পুরোনো বই, পুঁথি, ডায়েরি, চিঠি ও আত্মজীবনী।
৩. জমি কেনাবেচার দলিল ও বাজারের হিসাব।
৪. পুরোনো ছবি ও চিত্রকর্ম।
৫. মানচিত্র, পোস্টার ও বিজ্ঞাপন।
৬. সংবাদপত্র ও বিভিন্ন সাময়িকী।
৭. সরকারি আইন, প্রতিবেদন ও অন্যান্য দলিল।

এই উপাদানগুলি থেকে অতীত সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলি যাচাই করে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

৮. ইতিহাসের উপাদান যাচাই করে ব্যবহার করা দরকার কেন? উদাহরণ দাও।

উত্তর: ইতিহাসের প্রতিটি উপাদান একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি হয় না। কোনো লেখক নিজের অভিজ্ঞতা বা মতামতের ভিত্তিতে ঘটনা তুলে ধরতে পারেন। আবার কোনো ছবি একটি ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র প্রকাশ নাও করতে পারে। তাই উপাদানগুলি যাচাই না করে ব্যবহার করলে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে।

যেমন, আত্মজীবনীতে লেখক নিজের দৃষ্টিতে বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ দেন। সেখানে নিজের ভূমিকা বেশি গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আবার ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের একটি ছবিতে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু সেই সময় তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। শুধু ছবিটি দেখে সেই বিরোধ সম্পর্কে জানা সম্ভব নয়। তাই ইতিহাস লেখার সময় উপাদানের পাশাপাশি ঘটনার পটভূমিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

৯. ইতিহাসে সাধারণ মানুষের পরিচয় অনেক সময় পাওয়া যায় না কেন? সাঁওতাল বিদ্রোহের উদাহরণ দাও।

উত্তর: ইতিহাসের অনেক বইয়ে রাজা, নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের অবদান এবং তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয় অনেক সময় উপেক্ষিত হয়েছে। গণআন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত না করে শুধু একটি বড় জনসমষ্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি দেখা যায়। এই বিদ্রোহের সঙ্গে সিধু ও কানহুর নাম পরিচিত। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া অসংখ্য সাধারণ সাঁওতালের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তাঁদের অনেকের পরিচয় শুধু বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী জনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

১০. ‘রাজাবলি’ গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী? আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে এর পার্থক্য লেখো।

উত্তর: ১৮০৮ সালে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ‘রাজাবলি’ নামে একটি ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—

১. গ্রন্থে যুধিষ্ঠিরের সময় থেকে ইতিহাসের বিবরণ শুরু হয়েছে।
২. বিবরণ কলিযুগ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
৩. রাজা ও তাঁদের কর্মকাণ্ডের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যায় পৌরাণিক ও অতিপ্রাকৃত ধারণার প্রভাব রয়েছে।

অন্যদিকে, আধুনিক ইতিহাসে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা করতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ খোঁজা হয়। বিভিন্ন নথি ও প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়। তাই আধুনিক ইতিহাসচর্চায় অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার পরিবর্তে যুক্তি ও প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১১. ভারতের ইতিহাসে ‘আধুনিক’ শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা রয়েছে?

উত্তর: ‘আধুনিক’ শব্দটির অর্থ বর্তমান সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও ইতিহাসে এর ব্যবহার নিয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে।

প্রথমত, ইতিহাসের আধুনিক যুগের ঘটনা বর্তমান সময়ের ঘটনা নয়। যেমন, ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধকে আধুনিক যুগের ঘটনা বলা হলেও তা বহু বছর আগের।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপে নবজাগরণ, শিল্পবিপ্লব ও গণতন্ত্রের মতো যে পরিবর্তনগুলি আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়, ভারতের ইতিহাসে সেগুলি একই সময়ে ঘটেনি।

তৃতীয়ত, শুধু ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকে আধুনিক যুগের শুরু বলে ধরে নিলে ভারতের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলি যথাযথ গুরুত্ব পায় না।

তাই ভারতের ইতিহাসে আধুনিক যুগের সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।

১২. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে আত্মজীবনী ও ফটোগ্রাফ ব্যবহারের সময় কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়?

উত্তর: আত্মজীবনী ও ফটোগ্রাফ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এগুলি ব্যবহারের সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার।

আত্মজীবনীতে লেখক নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনা বর্ণনা করেন। তাই তাঁর বক্তব্যকে অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। উদাহরণ হিসেবে, উইলিয়ম ওয়েভারবার্নের লেখায় ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের বিবরণ তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বহন করতে পারে।

অন্যদিকে, ফটোগ্রাফে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের দৃশ্য ধরা পড়ে। কিন্তু সেই সময়ের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি ছবিতে ফুটে ওঠে না। ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুর হাসিমুখের ছবি তাঁদের রাজনৈতিক মতবিরোধের কথা প্রকাশ করে না।

তাই এই দুই ধরনের উপাদান ব্যবহার করার সময় সেগুলির পটভূমি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা জরুরি।

১৩. ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা ভারতে নিজেদের শাসনের পক্ষে কী যুক্তি দিতেন? ভারতীয়রা কীভাবে তার প্রতিবাদ করেছিলেন?

উত্তর: ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও শাসকদের একাংশের বক্তব্য ছিল, ভারতীয় সমাজ পিছিয়ে পড়া এবং ভারতীয়রা নিজেদের দেশ পরিচালনা করার উপযুক্ত নয়। তাঁদের দাবি ছিল, ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমে ভারতীয়দের শিক্ষা ও সভ্যতার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। এই যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা ভারতে নিজেদের শাসনকে সমর্থন করতেন।

ভারতীয় শিক্ষিত সমাজ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তাঁরা ভারতের অতীত থেকে নানা উদাহরণ তুলে ধরেন। যেমন—

১. সম্রাট অশোকের শাসন ও তাঁর ধর্মনীতি।
২. আর্যভট্ট ও বরাহমিহিরের জ্ঞানচর্চা।
৩. চরক ও সুশ্রুতের চিকিৎসাবিদ্যায় অবদান।
৪. চৈতন্যদেব ও কবীরের মানবতাবাদী চিন্তাভাবনা।
৫. মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস।

এই উদাহরণগুলির মাধ্যমে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতের নিজস্ব সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।

১৪. কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান কীভাবে প্রভাব ফেলে?

উত্তর: কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা যত সাম্প্রতিক হয়, তা নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও বিতর্ক অনেক সময় তত বেশি থাকে। কারণ, সেই ঘটনার সঙ্গে বর্তমানের মানুষের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্মৃতি জড়িয়ে থাকতে পারে। সময়ের ব্যবধান বাড়লে বিতর্কের গুরুত্ব ও ধরন বদলে যেতে পারে।

যেমন, সম্রাট অশোকের জীবনে কলিঙ্গ যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে এই বিতর্ক সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে না।

অন্যদিকে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের স্মৃতি এখনও বহু পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তাই দেশভাগের কারণ ও তার দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা আজও গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের সাম্প্রতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করার সময় ব্যক্তিগত স্মৃতি ও মতামতের প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।

১৫. জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝায়? ইতিহাস রচনায় জাতীয়তাবাদের প্রভাব আলোচনা করো।

উত্তর: নিজের দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা, গর্ব এবং দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্থ রক্ষার ইচ্ছাকে জাতীয়তাবাদ বলা হয়।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা ইতিহাস রচনাতেও প্রভাব ফেলে। ভারতীয় শিক্ষিত ব্যক্তিরা নিজেদের দেশের অতীত নিয়ে নতুনভাবে গবেষণা শুরু করেন। তাঁদের ইতিহাসচর্চায় কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়—

১. ভারতের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরা।
২. ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের প্রতিবাদ করা।
৩. ভারতীয়দের মধ্যে নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
৪. দেশের প্রতি আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলা।

এইভাবে জাতীয়তাবাদ ভারতীয় ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হয়।

১৬. ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ইতিহাসের একটি বিতর্কিত ঘটনা কেন?

উত্তর: ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পাশাপাশি দেশভাগও ঘটে। এই ঘটনার সঙ্গে বহু মানুষের জীবন ও পরিবারের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। দেশভাগের সময় বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয় এবং ব্যাপক প্রাণহানিও ঘটে।

দেশভাগের জন্য কারা কতটা দায়ী ছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের ভূমিকা, জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং ব্রিটিশদের নীতি—সবকিছু নিয়েই ঐতিহাসিকদের মধ্যে আলোচনা চলে।

এ ছাড়া দেশভাগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনেক পরিবারের স্মৃতিতে এখনও রয়েছে। তাই এই ঘটনা নিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আলোচনা করা কঠিন হতে পারে। এই সব কারণেই দেশভাগ ভারতের ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়।

১৭. ইতিহাস পড়া আকর্ষণীয় কেন? উদাহরণ দিয়ে বোঝাও।

উত্তর: ইতিহাসের কোনো ঘটনা সম্পর্কে শুধু কী ঘটেছিল তা জানলেই আলোচনা শেষ হয় না। কেন ঘটনাটি ঘটেছিল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এর ফলাফল কী হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন মত ও ব্যাখ্যা সামনে আসে। এই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাই ইতিহাসকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

একই ঘটনার বিষয়ে দুইজন ইতিহাসবিদ আলাদা তথ্য বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে ভিন্ন মত প্রকাশ করতে পারেন। যেমন, একটি ছবিকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখলে তার আলাদা অর্থ মনে হতে পারে। ইতিহাসের ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে ঘটনার ব্যাখ্যা বদলাতে পারে।

এই আলোচনা ও যুক্তি বিচার করার সুযোগ থাকায় ইতিহাস শুধু সাল-তারিখ মুখস্থ করার বিষয় হয়ে থাকে না।

১৮. ইতিহাসের যুগবিভাগ করার প্রয়োজনীয়তা ও অসুবিধাগুলি কী কী?

উত্তর: ইতিহাসের সময়কাল অনেক দীর্ঘ। তাই অতীতের ঘটনাগুলি সহজে বুঝতে এবং পড়াশোনার সুবিধার জন্য ইতিহাসকে বিভিন্ন যুগে ভাগ করা হয়।

যুগবিভাগের প্রয়োজনীয়তা:

১. দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে সাজিয়ে পড়া সহজ হয়।
২. একটি নির্দিষ্ট সময়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়।
৩. বিভিন্ন সময়ের ঘটনাগুলির ধারাবাহিকতা বুঝতে সুবিধা হয়।

যুগবিভাগের অসুবিধা:

১. এক যুগ থেকে অন্য যুগে পরিবর্তন হঠাৎ ঘটে না। তাই নির্দিষ্ট একটি সালকে যুগ পরিবর্তনের চূড়ান্ত সীমা ধরা সব সময় যুক্তিযুক্ত নয়।
২. ধর্মের ভিত্তিতে যুগ ভাগ করলে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের ইতিহাস একই ভাগে মিশে যেতে পারে।
৩. সব অঞ্চলে একই সময়ে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটে না। যেমন, ভারতের প্রাচীন যুগের অবসান ঘটলেও ইউরোপের ইতিহাসে সেই সময়ের পরিবর্তন একইভাবে ঘটেনি।

তাই ইতিহাসের যুগবিভাগ পড়াশোনায় সাহায্য করলেও এর সীমাবদ্ধতাগুলি মনে রাখা জরুরি।

Class 8 History Broad Questions and Answers in Bengali

নবম শ্রেণির ইতিহাস – বড়ো প্রশ্নোত্তর (৭টি)

১. ইতিহাস কী? ইতিহাস পড়ার প্রয়োজনীয়তা নিজের ভাষায় লেখো। ইতিহাসের গুরুত্ব বোঝাতে ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্পটি আলোচনা করো।

উত্তর:

ইতিহাসের অর্থ: মানুষের অতীত জীবন, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক বিবরণকে ইতিহাস বলা হয়। ইতিহাসের মাধ্যমে আমরা অতীতের ঘটনা এবং সেই ঘটনাগুলির কারণ ও প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারি। ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশা ও যুদ্ধের বিবরণ নয়, সাধারণ মানুষের জীবনও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইতিহাস পড়ার প্রয়োজনীয়তা:

১. বর্তমানকে বুঝতে: বর্তমান সমাজের অনেক নিয়ম, সমস্যা ও পরিবর্তনের সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস জানলে বর্তমান পরিস্থিতির কারণ বুঝতে সুবিধা হয়।

২. অতীত থেকে শিক্ষা নিতে: অতীতে মানুষ যেসব ভুল করেছে এবং যেসব সাফল্য অর্জন করেছে, সেগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

৩. নিজের পরিচয় জানতে: নিজের দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে জানার জন্য ইতিহাসের প্রয়োজন।

৪. যুক্তি ও প্রমাণ পেতে: অতীতের ঘটনা থেকে বিভিন্ন বিষয়ের পক্ষে যুক্তি পাওয়া যায়। নিজের অধিকার ও বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতেও ইতিহাসের তথ্য কাজে লাগে।

৫. সমাজের পরিবর্তন বুঝতে: সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা ও শাসনব্যবস্থায় কীভাবে পরিবর্তন এসেছে, তা ইতিহাসের মাধ্যমে জানা যায়।

ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্প:

একদিন একটি ছাগলছানা নদীর ধারে জল খেতে গিয়েছিল। সেখানে একটি নেকড়ে এসে তাকে খাওয়ার অজুহাত খুঁজতে থাকে। নেকড়ে অভিযোগ করে যে, ছাগলছানার পূর্বপুরুষ নাকি তার পূর্বপুরুষের অপমান করেছিল। ছাগলছানা নিজের যুক্তি দিয়ে সেই অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে। সে বোঝায়, পূর্বপুরুষের কোনো কাজের জন্য তাকে দোষী করা যায় না।

এই গল্প থেকে বোঝা যায়, অতীতের ঘটনা ব্যবহার করে কেউ নিজের স্বার্থে যুক্তি তৈরি করতে পারে। আবার সেই ইতিহাসের তথ্য দিয়েই অন্য কেউ নিজের পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে পারে।

ব্রিটিশ শাসকরাও ভারতীয়দের পিছিয়ে পড়া বলে নিজেদের শাসনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিল। এর প্রতিবাদে ভারতীয়রা দেশের প্রাচীন সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ইতিহাস তুলে ধরেন। তাই ইতিহাস শুধু অতীত জানার বিষয় নয়, যুক্তি দিয়ে কোনো বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

২. জেমস মিল কে ছিলেন? তিনি ভারতের ইতিহাসকে কীভাবে ভাগ করেছিলেন? তাঁর যুগবিভাগের সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো। পরবর্তীকালে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ধারণা কীভাবে প্রচলিত হয়?

উত্তর:

জেমস মিলের পরিচয়: জেমস মিল ছিলেন একজন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও দার্শনিক। তিনি ১৮১৭ সালে The History of British India নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি ভারতের ইতিহাসকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। ব্রিটিশদের ভারত সম্পর্কে ধারণা দেওয়াও এই গ্রন্থের একটি উদ্দেশ্য ছিল।

জেমস মিলের যুগবিভাগ:

জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে মোট তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। যথা—

১. হিন্দু যুগ: প্রাচীনকালের হিন্দু শাসকদের সময়কাল।
২. মুসলিম যুগ: মুসলিম শাসকদের শাসনকাল।
৩. ব্রিটিশ যুগ: ব্রিটিশ শাসনের সময়কাল।

প্রথম দুটি যুগের নামকরণ করা হয়েছিল শাসকদের ধর্ম অনুসারে। তৃতীয়টির নাম রাখা হয়েছিল শাসকদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে।

এই যুগবিভাগের সীমাবদ্ধতা:

১. ধর্মকে অতিরিক্ত গুরুত্ব: জেমস মিলের বিভাজনে শাসকদের ধর্মকে প্রধান ভিত্তি করা হয়েছিল। ফলে বিভিন্ন ধর্মের শাসক ও সমাজের বৈচিত্র্য ঠিকভাবে বোঝা যায় না। যেমন, জৈন ধর্ম গ্রহণকারী চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অশোককে হিন্দু যুগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

২. বিভিন্ন শাসকের পার্থক্য উপেক্ষা: মুসলিম শাসকদের মধ্যে রাজনৈতিক নীতি, শাসনব্যবস্থা ও চিন্তাভাবনার অনেক পার্থক্য ছিল। কিন্তু তাঁদের সবাইকে একই যুগে রাখা হয়েছিল।

৩. আঞ্চলিক ইতিহাসের গুরুত্ব কমে যাওয়া: ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদা সময়ে নানা পরিবর্তন ঘটেছিল। মাত্র তিনটি ভাগে ইতিহাস সাজালে সেই বৈচিত্র্য যথাযথভাবে প্রকাশ পায় না।

৪. অতিরিক্ত সরলীকরণ: ভারতের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসকে মাত্র তিনটি ভাগে সীমাবদ্ধ করায় বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে যায়।

প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের প্রচলন:

পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইতিহাস লেখার পদ্ধতির প্রভাবে ভারতের ইতিহাসকেও প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক—এই তিনটি ভাগে সাজানো হয়। সাধারণভাবে জেমস মিলের হিন্দু যুগকে প্রাচীন যুগ, মুসলিম যুগকে মধ্যযুগ এবং ব্রিটিশ যুগকে আধুনিক যুগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

এই যুগবিভাগ বর্তমানে বহুল প্রচলিত হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, ভারতের সব অঞ্চলে একই সময়ে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেনি। তাই এই ভাগকে ইতিহাস বোঝার একটি সুবিধাজনক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, সম্পূর্ণ নিখুঁত বিভাজন হিসেবে নয়।

৩. প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে ইতিহাস ভাগ করার ধারণাটি কেন সমস্যাসঙ্কুল? রাজিয়া সুলতান ও ঔরঙ্গজেব-পরবর্তী বাংলার উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করো।

উত্তর:

ভারতের ইতিহাসকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক—এই তিনটি যুগে ভাগ করা হলেও এই পদ্ধতির কিছু অসুবিধা রয়েছে। কারণ, ইতিহাসের এক যুগ থেকে অন্য যুগে পরিবর্তন হঠাৎ ঘটে না। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। তাই নির্দিষ্ট একটি সালকে ভিত্তি করে যুগের সীমানা নির্ধারণ করলে অনেক সময় প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়।

১. ঔরঙ্গজেব ও পলাশির যুদ্ধের উদাহরণ:

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয় ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে। তাঁকে সাধারণত মধ্যযুগের শেষ দিকের শাসক হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশির যুদ্ধকে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই দুই ঘটনার মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৫০ বছর। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেও বাংলার নবাবি প্রশাসনে মোগল শাসনব্যবস্থার অনেক রীতি চালু ছিল। অর্থাৎ, আধুনিক যুগের সূচনা বলে বিবেচিত সময়েও মধ্যযুগের অনেক বৈশিষ্ট্য বজায় ছিল। তাই শুধু সাল দিয়ে যুগের পার্থক্য বোঝা সব সময় সম্ভব নয়।

২. রাজিয়া সুলতানের উদাহরণ:

দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁর কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। রাজিয়া ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির সুলতানা হিসেবে শাসন করেন।

সময়ের হিসাবে রাজিয়া মধ্যযুগের শাসক। কিন্তু একজন নারী হিসেবে তাঁর সিংহাসনে বসা এবং শাসন পরিচালনা করা ছিল সেই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পরবর্তী সময়েও ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তাই নারীর শাসনক্ষমতার দিক থেকে রাজিয়ার শাসনকে আলাদাভাবে আলোচনা করা যায়। শুধু যুগের নাম দিয়ে তাঁর শাসনের বৈশিষ্ট্য বোঝা সম্ভব নয়।

৩. যুগের বৈশিষ্ট্য ধীরে পরিবর্তিত হয়:

একটি যুগের সব বৈশিষ্ট্য অন্য যুগের শুরুতেই শেষ হয়ে যায় না। যেমন, ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পরেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পুরোনো প্রশাসনিক ও রাজস্বব্যবস্থার কিছু অংশ চালু ছিল।

আবার ইউরোপে নবজাগরণ ও শিল্পবিপ্লবের মতো পরিবর্তন ভারতের সব অঞ্চলে একই সময়ে ঘটেনি। তাই ইউরোপের ইতিহাসের সময়সীমা অনুসরণ করে ভারতের ইতিহাসকে ভাগ করলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়।

উপসংহার: ইতিহাসের যুগবিভাগ পড়াশোনাকে সহজ করলেও তা সব সময় অতীতের প্রকৃত পরিবর্তনকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারে না। রাজিয়া সুলতান ও ঔরঙ্গজেব-পরবর্তী বাংলার উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, ইতিহাসের যুগ নির্ধারণের পাশাপাশি সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিচার করা জরুরি।

৪. সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ কাকে বলে? ভারতের ওপর এর প্রভাব আলোচনা করো। ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মধ্যে বিরোধ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:

সাম্রাজ্যবাদ: কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন অন্য একটি দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তখন তাকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। এর ফলে অধীনস্থ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও সম্পদের ওপর বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।

উপনিবেশবাদ: সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার একটি পদ্ধতি হলো উপনিবেশবাদ। কোনো শক্তিশালী দেশ অন্য দেশের অঞ্চল দখল করে সেখানকার মানুষ, সম্পদ, কাঁচামাল ও বাজারকে নিজের দেশের স্বার্থে ব্যবহার করলে তাকে উপনিবেশবাদ বলা হয়।

ভারতের ওপর সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের প্রভাব:

১. রাজনৈতিক প্রভাব: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে ভারতে বাণিজ্য করতে আসে। পরে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

২. অর্থনৈতিক প্রভাব: ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতের কৃষি ও শিল্পের ওপর ব্রিটেনের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাব পড়ে। ভারত থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে ব্রিটেনে শিল্পের কাজে ব্যবহার করা হতো।

৩. কৃষির ওপর প্রভাব: বাংলায় নীল চাষের প্রসারে কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ফসল চাষ করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষকদের সমস্যা বাড়ে।

৪. দেশীয় শিল্পের ওপর প্রভাব: ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক নীতির ফলে ভারতের অনেক দেশীয় শিল্প ও কারিগর নানা সমস্যার মুখে পড়েন।

ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের বিরোধ:

ঔপনিবেশিক ইতিহাস: ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের লেখা ইতিহাসে অনেক সময় ভারতীয় সমাজকে পিছিয়ে পড়া ও শাসনের অযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়েছিল। জেমস মিলের মতো ঐতিহাসিকরা ভারতের অতীতকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা ব্রিটিশ শাসনের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল।

জাতীয়তাবাদী ইতিহাস: ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এই ব্যাখ্যার প্রতিবাদে ভারতীয় শিক্ষিত সমাজ নিজেদের দেশের ইতিহাস নতুনভাবে চর্চা করতে শুরু করেন। তাঁরা ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক তুলে ধরেন।

অশোকের শাসন, গুপ্তযুগের কৃতিত্ব, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন এবং আর্যভট্ট ও চরকের মতো মনীষীদের অবদান তাঁদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর মাধ্যমে তাঁরা দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতের নিজস্ব সমৃদ্ধ সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য রয়েছে।

উপসংহার: ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্ব পেয়েছিল। অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে ভারতীয়দের নিজস্ব অতীত ও ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এই দুই ধরনের ইতিহাসচর্চার মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই ছিল প্রধান বিরোধের বিষয়।

৫. ইতিহাসের উপাদান কাকে বলে? আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনায় কী কী উপাদান ব্যবহার করা হয়? সেগুলি যাচাই করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকের ভূমিকা উদাহরণসহ আলোচনা করো।

উত্তর:

ইতিহাসের উপাদান: অতীতের কোনো ঘটনা, ব্যক্তি, সমাজ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে ইতিহাসবিদরা যেসব নথি, দলিল, প্রত্নবস্তু, ছবি ও অন্যান্য প্রমাণের সাহায্য নেন, সেগুলিকে ইতিহাসের উপাদান বলা হয়।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান:

আধুনিক যুগের বহু নথি ও প্রমাণ এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। তাই এই সময়ের ইতিহাস লেখার জন্য বিভিন্ন ধরনের উপাদান পাওয়া যায়।

১. সরকারি নথি: প্রশাসনিক কাগজপত্র, সরকারি আইন, আদেশ ও বিভিন্ন প্রতিবেদন।

২. ব্যক্তিগত লেখা: চিঠিপত্র, ডায়েরি, আত্মজীবনী ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা।

৩. অর্থনৈতিক দলিল: জমি কেনাবেচার দলিল, বাজারের হিসাব ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নথি।

৪. সংবাদপত্র ও সাময়িকী: বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদপত্র, পত্রিকা ও বিজ্ঞাপন।

৫. ছবি ও মানচিত্র: পুরোনো ফটোগ্রাফ, আঁকা ছবি, মানচিত্র, পোস্টার ও কার্টুন।

৬. মৌখিক ইতিহাস: দেশভাগ বা অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণ।

উপাদান যাচাই করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকের দায়িত্ব:

ইতিহাসের কোনো উপাদানকে যাচাই না করে সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ, কোনো লেখক বা ছবি প্রস্তুতকারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। তাই ঐতিহাসিককে বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয়। পাশাপাশি উপাদানটি কখন, কেন এবং কার দ্বারা তৈরি হয়েছিল, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।

উদাহরণ ১: আত্মজীবনী ও সিপাহি বিদ্রোহ

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ সম্পর্কে ব্রিটিশ লেখক উইলিয়ম ওয়েভারবার্নের মতো লেখকদের বিবরণ থেকে ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানা যায়। তবে কোনো একটি লেখার ওপর নির্ভর করলে বিদ্রোহের সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই অন্য উৎসের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সেই বিবরণ যাচাই করা প্রয়োজন।

উদাহরণ ২: হরিপুরা কংগ্রেসের ছবি

১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের একটি ছবিতে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। পরের বছর সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

শুধু ছবিটি দেখে তাঁদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ ছিল না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভুল হবে। ছবিটি একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের দৃশ্য দেখায়, পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি নয়।

উপসংহার: ইতিহাস রচনার সময় বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করার পাশাপাশি সেগুলি যাচাই করা জরুরি। একাধিক উৎসের তথ্য তুলনা করে এবং ঘটনার পটভূমি বুঝে তবেই ঐতিহাসিকের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত।

৬. ইতিহাস রচনায় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব আলোচনা করো। ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের পার্থক্য এবং নেকড়ে ও ছাগলছানার গল্পের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:

দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ ও ইতিহাসে তার প্রভাব:

কোনো ঘটনা বা বিষয়কে একজন ব্যক্তি যেভাবে দেখেন এবং ব্যাখ্যা করেন, সেটিই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। ইতিহাসবিদরাও নিজেদের সময়, অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা ও সামাজিক অবস্থানের প্রভাব নিয়ে অতীতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। তাই একই ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদের আলাদা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।

১. ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের উদাহরণ:

ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছিল। তাঁরা অনেক সময় ভারতীয় শাসকদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশের অতীতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তাঁরা ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামকে গুরুত্ব দেন।

পলাশির যুদ্ধ ও সিরাজ-উদ-দৌলার প্রসঙ্গেও এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা যায়। কিছু ঔপনিবেশিক বিবরণে সিরাজ-উদ-দৌলাকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চায় তাঁর শাসন ও ইংরেজদের সঙ্গে সংঘাতকে বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে বিচার করা হয়েছে।

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, একই ঐতিহাসিক ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

২. নেকড়ে ও ছাগলছানার গল্প:

একদিন একটি ছাগলছানা নদীর ধারে জল খেতে গেলে একটি নেকড়ে তাকে খাওয়ার অজুহাত খুঁজতে থাকে। নেকড়ে ছাগলছানার পূর্বপুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। ছাগলছানা নিজের যুক্তি দিয়ে সেই অভিযোগের প্রতিবাদ করে।

গল্পটিতে নেকড়ে নিজের স্বার্থে অতীতের একটি ঘটনাকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, ছাগলছানাও যুক্তি দিয়ে সেই ঘটনার অন্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে।

এই গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের মিল রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা শাসক নিজের স্বার্থে অতীতের ঘটনাকে বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। আবার অন্য কেউ সেই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে নতুন তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরতে পারেন।

উপসংহার: ইতিহাস রচনায় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু নিজের মতের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎসের তথ্য যাচাই করা দরকার। তবেই কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আরও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যায় পৌঁছনো সম্ভব।

৭. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের সময়সীমা ও বিষয়বস্তু আলোচনা করো। এই ইতিহাস রচনার উপাদানগুলি কী কী? একটি উদাহরণের সাহায্যে উপাদানের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের সময়সীমা:

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের শুরু ও শেষের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। সাধারণভাবে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে, বিশেষত ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর থেকে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা ও দেশভাগ পর্যন্ত সময়কে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে ধরা হয়। কেউ কেউ ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়ার ঘটনাকেও এই ইতিহাসের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেন।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের বিষয়বস্তু:

১. ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তার।
২. ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব।
৩. কৃষক ও আদিবাসীদের বিভিন্ন বিদ্রোহ, যেমন সাঁওতাল বিদ্রোহ।
৪. ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ।
৫. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা।
৬. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলন।
৭. গান্ধিজির নেতৃত্বে অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন।
৮. ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগ।
৯. ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়া এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান:

এই সময়ের ইতিহাস জানার জন্য প্রচুর লিখিত ও দৃশ্য উপাদান পাওয়া যায়। যেমন—

১. সরকারি নথি, আইন ও প্রশাসনিক প্রতিবেদন।
২. বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তির চিঠি, ডায়েরি ও আত্মজীবনী।
৩. সংবাদপত্র ও সাময়িকী, যেমন ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ ও ‘হরিজন’।
৪. ফটোগ্রাফ, পোস্টার, মানচিত্র ও কার্টুন।
৫. দেশভাগ ও অন্যান্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ।

উপাদানের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ:

ইতিহাসের উপাদান ব্যবহার করার সময় ঐতিহাসিককে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই চলে না। উপাদানটির বিশ্বাসযোগ্যতা, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্কও বিচার করতে হয়। একই ঘটনার একাধিক উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

উদাহরণ: ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসের ফটোগ্রাফ

১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের একটি ছবিতে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু এই ছবি তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।

১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু গান্ধিজির সমর্থক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং পরে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।

তাই শুধু হরিপুরা অধিবেশনের ছবিটি দেখে কংগ্রেসের মধ্যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ঐক্য ছিল বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ছবির পাশাপাশি সেই সময়ের সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, রাজনৈতিক বিবৃতি ও অন্যান্য নথিও পরীক্ষা করা দরকার।

উপসংহার: আধুনিক ভারতের ইতিহাসের জন্য নানা ধরনের উপাদান পাওয়া গেলেও সব উপাদান একইভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। তাই ঐতিহাসিককে তথ্য যাচাই, বিভিন্ন উৎসের তুলনা এবং ঘটনার পটভূমি বিশ্লেষণ করে ইতিহাস রচনা করতে হয়।

Leave a Comment