WBBSE Class 8 History Chapter 7 Question and Answers

Chapter 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন (Ideals & Evolution of National Movement)

অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস – অষ্টম অধ্যায়: ভারতের জাতীয় আন্দোলন (গুরুত্বপূর্ণ ৩০টি বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর)

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাসের অষ্টম অধ্যায় ‘ভারতের জাতীয় আন্দোলন’ পরীক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের কথা মাথায় রেখে নিচে ৩০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ), সঠিক উত্তর ও তার সহজ-সরল ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

১. ভারতের মাটিতে মহাত্মা গান্ধীর প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন কোনটি ছিল? ক) অসহযোগ আন্দোলন খ) চম্পারণ সত্যাগ্রহ গ) ভারত ছাড়ো আন্দোলন ঘ) আইন অমান্য আন্দোলন

সঠিক উত্তর: খ) চম্পারণ সত্যাগ্রহ

ব্যাখ্যা: ১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারণে নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচারের প্রতিবাদে গান্ধীজি এই আন্দোলন শুরু করেন। শোষিত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে এটিই ছিল ভারতে তাঁর নেতৃত্বে প্রথম সফল সত্যাগ্রহ আন্দোলন।

২. গান্ধীজির মতে ‘স্বরাজ’-এর প্রকৃত অর্থ কী? ক) কেবল ব্রিটিশ শাসনের অবসান খ) শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, পাশ্চাত্য যন্ত্র-নির্ভর সভ্যতা ও শোষণের অবসান গ) দেশীয় রাজাদের শাসন ঘ) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব

সঠিক উত্তর: খ) শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, পাশ্চাত্য যন্ত্র-নির্ভর সভ্যতা ও শোষণের অবসান

ব্যাখ্যা: ১৯০৯ সালে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’ বইতে গান্ধীজি স্পষ্ট করেন যে, কেবল ইংরেজদের তাড়িয়ে দিলেই আসল স্বরাজ আসবে না। মানুষের শোষণ মুক্তি, গ্রামীণ স্বনির্ভরতা (যার প্রতীক চরকা) এবং পাশ্চাত্য ভোগবাদী সভ্যতার আগ্রাসন থেকে মুক্তিই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা।

৩. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড কত সালে সংঘটিত হয়? ক) ১৯১৮ খ) ১৯১৯ গ) ১৯২০ ঘ) ১৯২১

সঠিক উত্তর: খ) ১৯১৯

ব্যাখ্যা: ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এই নৃশংসতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন।

৪. জাতীয় কংগ্রেস কেন খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল? ক) তুরস্ক দখলের জন্য খ) ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থন পেয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ভিত্তিতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন গড়তে গ) খলিফা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ঘ) যুদ্ধে যোগ দিতে

সঠিক উত্তর: খ) ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থন পেয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ভিত্তিতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন গড়তে

ব্যাখ্যা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের খলিফার সম্মানহানির প্রতিবাদে মুসলিমরা খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করে। গান্ধীজি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের একজোট করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও যৌথ গণআন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

৫. অসহযোগ আন্দোলনের ডাক কবে দেওয়া হয়েছিল? ক) ১৯১৯ খ) ১৯২১ গ) ১৯২২ ঘ) ১৯৩০

সঠিক উত্তর: খ) ১৯২১

ব্যাখ্যা: জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং রাওলাট আইনের মতো অন্যায়ের প্রতিবাদে ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এতে দেশের ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্রিটিশদের সরকারি কাজ বর্জন করেন।

৬. কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়? ক) ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে খ) চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার জন্য গ) কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে ঘ) বৃষ্টির অভাবে

সঠিক উত্তর: খ) চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার জন্য

ব্যাখ্যা: ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরা গ্রামে উন্মত্ত জনতা একটি পুলিশ থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশকে পুড়িয়ে মারে। অহিংসায় দৃঢ় বিশ্বাসী গান্ধীজি এই হিংসাত্মক ঘটনায় গভীরভাবে ব্যথিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।

৭. স্বরাজ্য দল কারা এবং কেন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? ক) গান্ধি ও নেহরু, স্বাধীনতার জন্য খ) চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু, কাউন্সিলে প্রবেশ করে আইনসভার ভেতর থেকে বাধা দিতে গ) জিন্না ও ইকবাল, পাকিস্তানের জন্য ঘ) ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদ, সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য

সঠিক উত্তর: খ) চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু, কাউন্সিলে প্রবেশ করে আইনসভার ভেতর থেকে বাধা দিতে

ব্যাখ্যা: অসহযোগ আন্দোলন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহরু ১৯২২ সালের শেষে এই দল গড়েন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে জিতে আইনসভায় ঢুকে ব্রিটিশ সরকারের কাজে পদে পদে আইনি বাধা সৃষ্টি করা।

৮. সাইমন কমিশন কবে ভারতে আসে এবং কেন ভারতীয়রা এটি বয়কট করে? ক) ১৯১৯; ভারতীয় সদস্য না থাকায় খ) ১৯২৭; কোনো ভারতীয় সদস্য ছিল না বলে, ‘সাইমন ফিরে যাও’ স্লোগান ওঠে গ) ১৯৩০; আইন মান্য না করায় ঘ) ১৯৩৫; বঙ্গভঙ্গের জন্য

সঠিক উত্তর: খ) ১৯২৭; কোনো ভারতীয় সদস্য ছিল না বলে, ‘সাইমন ফিরে যাও’ স্লোগান ওঠে

ব্যাখ্যা: ১৯২৭ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশরা ভারতের সাংবিধানিক অধিকার পর্যালোচনার জন্য এই কমিশন গঠন করে। কিন্তু স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে তৈরি এই কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ হয় এবং ‘সাইমন গো ব্যাক’ স্লোগান ওঠে।

৯. আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা কীভাবে ঘটেছিল? ক) বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে খ) গান্ধীজির ডান্ডি লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে গ) সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে ঘ) রেললাইন উপড়ে ফেলার মাধ্যমে

সঠিক উত্তর: খ) গান্ধীজির ডান্ডি লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে

ব্যাখ্যা: ১৯৩০ সালের ৬ এপ্রিল গুজরাটের ডান্ডি উপকূলে সমুদ্র থেকে একমুঠো লবণ তুলে গান্ধীজি ব্রিটিশদের তৈরি অন্যায্য লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমেই গোটা দেশে আইন অমান্য আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে।

১০. ইতিহাসে ‘সীমান্ত গান্ধী’ (Frontier Gandhi) নামে কে বেশি পরিচিত? ক) মৌলানা আবুল কালাম আজাদ খ) খান আবদুল গফফর খান গ) মহাত্মা গান্ধি ঘ) জওহরলাল নেহরু

সঠিক উত্তর: খ) খান আবদুল গফফর খান

ব্যাখ্যা: উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে তিনি গান্ধীজির অহিংস নীতির আদর্শে বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর অনুগামীদের বলা হতো ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ বা ‘লালকুর্তা বাহিনী’। গান্ধীজির প্রতি অটুট আনুগত্যের জন্যই তাঁকে ‘সীমান্ত গান্ধী’ উপাধি দেওয়া হয়।

১১. চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের প্রধান রূপকার কে ছিলেন? ক) ভগৎ সিং খ) সূর্য সেন (মাস্টারদা) গ) বিনয়-বাদল-দীনেশ ঘ) চন্দ্রশেখর আজাদ

সঠিক উত্তর: খ) সূর্য সেন (মাস্টারদা)

ব্যাখ্যা: ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল অকুতোভয় বিপ্লবী চট্টগ্রামের ব্রিটিশ অস্ত্রাগার দখল করেন। পরে জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজ সেনার সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে বহু বিপ্লবী শহীদ হন। ১৯৩৪ সালে মাস্টারদাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

১২. ভগৎ সিং মূলত কোন ঘটনার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন? ক) জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড খ) লালা লাজপত রায়ের ওপর পুলিশি অত্যাচারে মৃত্যুর প্রতিশোধ গ) ক্ষুদিরামের ফাঁসির প্রতিশোধ ঘ) বাঘা যতীনের মৃত্যুর প্রতিশোধ

সঠিক উত্তর: খ) লালা লাজপত রায়ের ওপর পুলিশি অত্যাচারে মৃত্যুর প্রতিশোধ

ব্যাখ্যা: সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে মিছিলে পুলিশের লাঠির ঘায়ে ‘পাঞ্জাব কেশরী’ লালা লাজপত রায় প্রাণ হারান। এই হত্যার বদলা নিতেই ১৯২৮ সালে ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীরা লাহোরের পুলিশ সুপার স্যান্ডার্সকে গুলি করে হত্যা করেন।

১৩. স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার কবে এবং কোথায় আত্মপ্রকাশ করে? ক) ১৯৪২, দিল্লি খ) ১৯৪৩, সিঙ্গাপুর গ) ১৯৪৫, কলকাতা ঘ) ১৯৪৭, করাচি

সঠিক উত্তর: খ) ১৯৪৩, সিঙ্গাপুর

ব্যাখ্যা: ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুরে ‘আজাদ হিন্দ সরকার’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেই এই অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে (INA) নতুনভাবে সুসংগঠিত করেন।

১৪. ‘রানি ঝাঁসি বাহিনী’ বলতে কী বোঝায়? ক) ঝাঁসির সেনাবাহিনী খ) আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী সৈন্যদলের নাম গ) বাঘা যতীনের দল ঘ) ভগৎ সিংয়ের সেনাদল

সঠিক উত্তর: খ) আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী সৈন্যদলের নাম

ব্যাখ্যা: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নারীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি বিশেষ সামরিক শাখা তৈরি করেছিলেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘রানি ঝাঁসি বাহিনী’। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বীরাঙ্গনা রানি লক্ষ্মীবাইয়ের স্মরণে গঠিত এই বাহিনীতে প্রায় ১৩০০ নারী সৈনিক ছিলেন।

১৫. নৌ-বিদ্রোহ বা রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ কবে সংঘটিত হয়েছিল? ক) ১৯৪২ খ) ১৯৪৫ গ) ১৯৪৬ ঘ) ১৯৪৭

সঠিক উত্তর: গ) ১৯৪৬

ব্যাখ্যা: ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বাই বন্দরের ‘তলোয়ার’ জাহাজের নাবিকরা প্রথম এই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। খারাপ খাবার, বর্ণবৈষম্য এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দিদের মুক্তির দাবিতে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ দ্রুত সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৬. গান্ধীজির ‘অহিংস সত্যাগ্রহ’ নীতির মূল ভিত্তি কী ছিল? ক) সশস্ত্র বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল খ) সত্যের প্রতি অটল থাকা ও অহিংসার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা গ) ব্রিটিশদের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি করা ঘ) আইনসভার নির্বাচনে জেতা

সঠিক উত্তর: খ) সত্যের প্রতি অটল থাকা ও অহিংসার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা

ব্যাখ্যা: গান্ধীজির সত্যাগ্রহ কোনো দুর্বলতা ছিল না, এটি ছিল আত্মিক শক্তির এক কঠোর লড়াই। এর মূল কথা হলো— সত্যকে আঁকড়ে ধরে অহিংস উপায়ে প্রতিপক্ষের মনে পরিবর্তন আনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণকে একত্রিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

১৭. ‘রাওলাট আইন’ কী এবং কেন এর তীব্র বিরোধিতা করা হয়? ক) শিক্ষা সংস্কার আইন খ) বিনা বিচারে বন্দি রাখার কালো আইন— যা ভারতীয়দের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয় গ) ভূমি রাজস্ব আইন ঘ) বিবাহ সংক্রান্ত আইন

সঠিক উত্তর: খ) বিনা বিচারে বন্দি রাখার কালো আইন— যা ভারতীয়দের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়

ব্যাখ্যা: ১৯১৯ সালের এই দমনমূলক আইনে ব্রিটিশ পুলিশ যেকোনো ভারতীয়কে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করে দিনের পর দিন আটকে রাখতে পারত। মানুষের স্বাভাবিক অধিকার কেড়ে নেওয়ায় গান্ধীজি একে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে হরতালের ডাক দেন।

১৮. বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা কে ছিলেন? ক) কংগ্রেস সভানেত্রী খ) মেদিনীপুর জেলার তমলুকের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শহীদ নেত্রী গ) আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী সৈনিক ঘ) ব্রিটিশ প্রশাসক

সঠিক উত্তর: খ) মেদিনীপুর জেলার তমলুকের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শহীদ নেত্রী

ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের তমলুকে এক বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ৭৩ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা। পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেলেও তিনি হাত থেকে জাতীয় পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি। তিনি ‘গান্ধীবুড়ি’ নামেও পরিচিত।

১৯. ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ আন্দোলন কীসের সঙ্গে যুক্ত? ক) একটি শিক্ষা আন্দোলন খ) কলকাতার ‘অন্ধকূপ’ স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণের দাবিতে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গণআন্দোলন গ) কৃষক আন্দোলন ঘ) ধর্মীয় আন্দোলন

সঠিক উত্তর: খ) কলকাতার ‘অন্ধকূপ’ স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণের দাবিতে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গণআন্দোলন

ব্যাখ্যা: ইংরেজদের বানানো তথাকথিত ‘অন্ধকূপ হত্যা’র স্মৃতিস্তম্ভটি ভারতীয়দের জন্য চরম অপমানজনক ছিল। ১৯৩৯ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে এই মনুমেন্ট ভেঙে ফেলার দাবিতে বিশাল গণআন্দোলন হয়, যার চাপে ব্রিটিশরা সেটি সরাতে বাধ্য হয়।

২০. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে গান্ধীজির দেওয়া বিখ্যাত স্লোগানটি কী ছিল? ক) ‘বন্দেমাতরম’ খ) ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ (Do or Die) গ) ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ঘ) ‘ভারত ছাড়ো’

সঠিক উত্তর: খ) ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ (Do or Die)

ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট বোম্বাই অধিবেশন থেকে গান্ধীজি ইংরেজদের ভারত ছাড়ার চরম হুঁশিয়ারি দেন। দেশবাসীকে তিনি মন্ত্র দেন— “হয় আমরা দেশকে স্বাধীন করব, নয়তো এই প্রচেষ্টায় প্রাণ দেব”।

২১. সুভাষচন্দ্র বসু কেন কংগ্রেস ছেড়ে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন? ক) ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য খ) কংগ্রেসের ডানপন্থী রক্ষণশীল নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধ ও গান্ধিবাদী কৌশলের বিরোধিতায় গ) ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে ঘ) জাপানে যাওয়ার জন্য

সঠিক উত্তর: খ) কংগ্রেসের ডানপন্থী রক্ষণশীল নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধ ও গান্ধিবাদী কৌশলের বিরোধিতায়

ব্যাখ্যা: সুভাষচন্দ্র চাইছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত ও আপসহীন সংগ্রাম। কিন্তু গান্ধীজি ও কংগ্রেসের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের অহিংস নীতির সাথে তাঁর আদর্শগত সংঘাত চরমে ওঠে। ফলে ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতির পদ ছেড়ে তিনি নতুন দল ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ তৈরি করেন।

২২. ইতিহাসে ‘বিনয়-বাদল-দীনেশ’ কাদের বলা হয়? ক) কংগ্রেসের তিন সভাপতি খ) রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণকারী তিন বিপ্লবী গ) আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতি ঘ) আইন অমান্যের নেতা

সঠিক উত্তর: খ) রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণকারী তিন বিপ্লবী

ব্যাখ্যা: ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত ইউরোপীয় পোশাকে সেজে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ঢুকে অত্যাচারী ব্রিটিশ অফিসার সিম্পসনকে গুলি করে মারেন। ধরা না দিয়ে বাদল বিষপান করেন, বিনয় নিজের মাথায় গুলি করেন এবং পরে দীনেশের ফাঁসি হয়।

২৩. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ এবং ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যে মূল মিলটি কোথায়? ক) দুটিই শুধু সিপাহি বিদ্রোহ ছিল খ) দুটিতেই ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়ে ব্যাপক গণঅংশগ্রহণ হয়েছিল গ) দুটিই একদিনে শেষ হয়েছিল ঘ) দুটিই ইংরেজ নেতৃত্বে হয়েছিল

সঠিক উত্তর: খ) দুটিতেই ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়ে ব্যাপক গণঅংশগ্রহণ হয়েছিল

ব্যাখ্যা: এই দুটি আন্দোলনই ছিল ব্রিটিশদের ভারত থেকে উৎখাত করার জন্য সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বাত্মক অভ্যুত্থান। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারি দমন-পীড়ন সত্ত্বেও সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

২৪. আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি সেনাদের ঐতিহাসিক বিচার কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল? ক) সংসদ ভবন খ) লালকেল্লা গ) রাষ্ট্রপতি ভবন ঘ) ইন্ডিয়া গেট

সঠিক উত্তর: খ) লালকেল্লা

ব্যাখ্যা: ১৯৪৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের তিন বীর অফিসার— প্রেমকুমার সেহগল, গুরুবক্স সিং ধিলোঁ এবং শাহনওয়াজ খানের বিচার শুরু হয়। এর প্রতিবাদে গোটা ভারতবর্ষ উত্তাল হয়ে ওঠে। তাঁদের আইনি সুরক্ষা দিতে জওহরলাল নেহরু সহ শীর্ষ আইনজীবীরা আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন।

২৫. ‘গান্ধী-আরউইন চুক্তি’ কত সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল? ক) ১৯২১ খ) ১৯৩১ গ) ১৯৪২ ঘ) ১৯৪৭

সঠিক উত্তর: খ) ১৯৩১

ব্যাখ্যা: ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ মহাত্মা গান্ধী এবং তৎকালীন বড়লাট লর্ড আরউইনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। শর্ত অনুযায়ী, ব্রিটিশরা রাজবন্দিদের মুক্তি দেয় এবং লবণ আইন কিছুটা শিথিল করে। বিনিময়ে কংগ্রেস আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত রেখে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেয়।

২৬. সুভাষচন্দ্র বসু কবে এবং কীভাবে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন? ক) ১৯২১, গান্ধির ইচ্ছায় খ) ১৯৩৮, হরিপুরা কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে গ) ১৯৩৯, ত্রিপুরী কংগ্রেসে গান্ধিকে হারিয়ে ঘ) ১৯৪২, ভারত ছাড়োর সময়

সঠিক উত্তর: খ) ১৯৩৮, হরিপুরা কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে (এবং ১৯৩৯ সালে নির্বাচিত হন)

ব্যাখ্যা: ১৯৩৮ সালে হরিপুরায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হন। এরপর ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে ভোটে হারিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার সভাপতি নির্বাচিত হন, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

২৭. মহাত্মা গান্ধী কেন ‘চরকা’-কে স্বরাজের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন? ক) এটি ব্রিটিশ আবিষ্কার ছিল খ) চরকা ভারতের গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, অহিংসা ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক গ) এটি সবচেয়ে দ্রুতগামী যন্ত্র ঘ) চরকা শুধু কাপড় বোনার যন্ত্র

সঠিক উত্তর: খ) চরকা ভারতের গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, অহিংসা ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক

ব্যাখ্যা: গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন, গ্রামের মানুষ নিজের চরকায় সুতো কেটে কাপড় বুনলে বিদেশি কাপড়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। চরকা ছিল একইসঙ্গে ব্রিটিশ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভাঙার হাতিয়ার এবং গ্রামীণ মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরতার সবচেয়ে বড় প্রতীক।

২৮. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় প্রতিষ্ঠিত ‘তামলুক জাতীয় সরকার’ আসলে কী ছিল? ক) ব্রিটিশদের তৈরি সরকার খ) মেদিনীপুরের তামলুকে গঠিত সমান্তরাল জাতীয় সরকার গ) সুভাষচন্দ্রের সরকার ঘ) মিত্র সরকার

সঠিক উত্তর: খ) মেদিনীপুরের তামলুকে গঠিত সমান্তরাল জাতীয় সরকার

ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের তামলুকে সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে ব্রিটিশ প্রশাসনকে হটিয়ে স্বাধীন ‘তামলুক জাতীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকার প্রায় দু-বছর ধরে ওই অঞ্চলে নিজস্ব পুলিশ, আদালত এবং ঘূর্ণিঝড় ত্রাণ ব্যবস্থা অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করেছিল।

২৯. সুভাষচন্দ্র বসুকে ‘নেতাজি’ উপাধি কারা দিয়েছিলেন? ক) তিনি কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন বলে খ) জার্মানিতে ভারতীয় বন্দিদের দ্বারা প্রদত্ত সম্মানসূচক উপাধি গ) ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নাম

সঠিক উত্তর: খ) জার্মানিতে ভারতীয় বন্দিদের দ্বারা প্রদত্ত সম্মানসূচক উপাধি

ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালে জার্মানিতে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের একত্রিত করে সুভাষচন্দ্র ‘ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার’ বা স্বাধীন ভারত কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তাঁর অসামান্য নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে সেখানকার ভারতীয় সেনারাই তাঁকে ভালোবেসে ‘নেতাজি’ বলে ডাকতে শুরু করেন।

৩০. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীযুগের (১৯১৯-১৯৪৭) মূল কৌশল কী ছিল? ক) সশস্ত্র বিপ্লব খ) অহিংস সত্যাগ্রহ, অসহযোগ, আইন অমান্য ও গণআন্দোলন গ) বিলাত গিয়ে দরবার ঘ) শুধু সংসদীয় রাজনীতি

সঠিক উত্তর: খ) অহিংস সত্যাগ্রহ, অসহযোগ, আইন অমান্য ও গণআন্দোলন

ব্যাখ্যা: গান্ধীজির রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি অহিংসার পথে সত্যাগ্রহ, বিদেশি জিনিস ও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বয়কট (অসহযোগ) এবং অন্যায় আইন ভঙ্গ করার (আইন অমান্য) মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।

আপনার ওয়েবসাইটের জন্য অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের অষ্টম অধ্যায়ের (ভারতের জাতীয় আন্দোলন) প্রশ্নোত্তরগুলো সম্পূর্ণ নতুনভাবে, সহজ ও আকর্ষণীয় ভাষায় সাজিয়ে দেওয়া হলো। এই ফরম্যাটটি সরাসরি কপি করে আপনার সাইটে পাবলিশ করতে পারবেন এবং এটি এসইও (SEO) ও ছাত্রছাত্রীদের পড়ার সুবিধার দিক থেকে অনেক বেশি কার্যকরী হবে।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (SAQ) – মান ২/৩

১. মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংস সত্যাগ্রহ’-এর মূল ভিত্তিগুলি কী ছিল?

মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংস সত্যাগ্রহ’ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অনন্য নৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার। এর মূল ভিত্তিগুলি হলো:

  • সত্যের প্রতি অবিচল থাকা: গান্ধীজির মতে, মানবজীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো সত্যের পথে চলা।
  • অহিংসা: কোনোভাবেই প্রতিপক্ষকে আঘাত না করে, নিজের আত্মত্যাগ ও কষ্টের মাধ্যমে শত্রুর মন পরিবর্তন করা।
  • গণ-অংশগ্রহণ: এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান অপরিহার্য। এটি ছিল কঠোর শৃঙ্খলার এক আত্মিক লড়াই।

২. রাওলাট আইন কী? ভারতীয়রা কেন এর প্রতিবাদ করেছিল?

  • রাওলাট আইন (১৯১৯): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে এই নিবর্তনমূলক আইন পাস করে। এই আইনের বলে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় যেকোনো ভারতীয়কে গ্রেপ্তার এবং বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারত।
  • প্রতিবাদ: গান্ধীজি একে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে হরতাল ও অহিংস সত্যাগ্রহের ডাক দেন। এই আইনের প্রতিবাদ করতে গিয়েই পাঞ্জাবে জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

৩. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল কী ছিল?

  • প্রেক্ষাপট: রাওলাট আইনের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে এক শান্তিপূর্ণ জনসভা চলছিল। ব্রিটিশ সেনাপতি জেনারেল ডায়ার আচমকা সেই মাঠের একমাত্র বেরোনোর রাস্তা বন্ধ করে নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালান।
  • ফলাফল: হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ হতাহত হন। গোটা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং প্রতিবাদস্বরূপ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘নাইটহুড’ বা ‘স্যার’ উপাধি ত্যাগ করেন।

৪. অসহযোগ আন্দোলনের মূল কর্মসূচি কী ছিল এবং এটি কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়?

  • কর্মসূচি: ১৯২১ সালে গান্ধীজির ডাকা এই আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল— স্কুল, কলেজ ও আদালত বর্জন করা, বিদেশি দ্রব্য ও বিলিতি কাপড় পোড়ানো এবং চরকা ও স্বদেশি শিল্পের প্রসার ঘটানো।
  • প্রত্যাহারের কারণ: ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরা গ্রামে উত্তেজিত জনতা একটি থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশকে পুড়িয়ে মারে। অহিংসা লঙ্ঘিত হওয়ায় গান্ধীজি গভীরভাবে মর্মাহত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন স্থগিত করে দেন।

৫. স্বরাজ্য দল কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? এর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

  • প্রতিষ্ঠা: অসহযোগ আন্দোলন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৯২২ সালের শেষে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহরু মিলে ‘স্বরাজ্য দল’ গঠন করেন।
  • উদ্দেশ্য: এঁদের মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনে জিতে আইনসভায় (কাউন্সিলে) প্রবেশ করা এবং ভেতর থেকে ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় আইন প্রণয়নে পদে পদে আইনি বাধা সৃষ্টি করা।

৬. সাইমন কমিশন কেন বয়কট করা হয়েছিল এবং এর ফলাফল কী হয়?

  • বয়কটের কারণ: ১৯২৭ সালে ভারতের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে এই কমিশন ভারতে আসে। কিন্তু সাত সদস্যের এই কমিশনে একজনও ভারতীয় না থাকায় গোটা দেশের মানুষ অপমানিত বোধ করে এবং এটি বয়কট করে।
  • ফলাফল: সাইমন কমিশন যেখানেই গেছে, সেখানেই ‘সাইমন গো ব্যাক’ স্লোগান ও কালো পতাকা দেখানো হয়েছে। এর প্রতিবাদ মিছিলেই পুলিশের লাঠির আঘাতে লালা লাজপত রায় শহীদ হন।

৭. আইন অমান্য আন্দোলন কীভাবে শুরু হয়েছিল? এর বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

  • সূচনা: ১৯৩০ সালের ৬ এপ্রিল গুজরাটের ডান্ডি উপকূলে গান্ধীজি নিজের হাতে সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরি করে ব্রিটিশদের অন্যায্য ‘লবণ আইন’ ভঙ্গ করেন। এর মাধ্যমেই দেশজুড়ে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়।
  • বৈশিষ্ট্য: এই আন্দোলনে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশাল অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং সরকারি কর বন্ধ করে দেওয়া ছিল এর অন্যতম হাতিয়ার।

৮. মাস্টারদা সূর্য সেন ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনাটি সংক্ষেপে লেখো।

মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান নেতা। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল তাঁর নেতৃত্বে একদল অকুতোভয় তরুণ ব্রিটিশদের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করে নেয়। ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজ সেনার সাথে তাঁদের তুমুল সম্মুখযুদ্ধ হয়, যেখানে ১১ জন বিপ্লবী শহীদ হন। পরে ১৯৩৪ সালে মাস্টারদাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

৯. বিপ্লবী ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীদের সংগ্রামের মূল দিকগুলি কী ছিল?

ভগৎ সিং ছিলেন ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর বদলা নিতে তিনি ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ পুলিশ সুপার স্যান্ডার্সকে হত্যা করেন। পরে ১৯২৯ সালে বধির ব্রিটিশ সরকারের কান খোলার জন্য কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা ছুঁড়ে স্বেচ্ছায় ধরা দেন। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর ফাঁসি হয়। তাঁদের দেওয়া ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান আজও অমর।

১০. গান্ধীজির লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’ বইটির মূল বক্তব্য কী?

১৯০৯ সালে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’ গ্রন্থে গান্ধীজি বলেন, শুধু ইংরেজদের তাড়িয়ে দিলেই প্রকৃত স্বরাজ আসবে না। আধুনিক পাশ্চাত্য ভোগবাদী সভ্যতার আগ্রাসন থেকে ভারতকে বাঁচাতে হবে। গ্রামীণ কুটিরশিল্প (চরকা), সহজ-সরল জীবনযাপন এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার মাধ্যমেই দেশ প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করবে।

১১. নৌ-বিদ্রোহ বা রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি (RIN) বিদ্রোহের গুরুত্ব কী?

১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বাই বন্দরে ‘তলোয়ার’ জাহাজের নাবিকরা খারাপ খাবার ও বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। দ্রুত এই বিদ্রোহ সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। এই বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর তারা আর ভরসা করতে পারবে না, যা ভারতের স্বাধীনতা লাভকে ত্বরান্বিত করেছিল।

১২. কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনের (১৯৩৯) ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?

এই অধিবেশনে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শগত সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে ভোটে হারিয়ে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু পরে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের অসহযোগিতার কারণে তিনি পদত্যাগ করে নিজের নতুন দল ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন।

১৩. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের (১৯৪২) মূল কারণ ও গুরুত্ব কী?

  • কারণ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের সম্মতি ছাড়াই ভারতকে জড়িয়ে নেওয়া, ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা এবং দেশজুড়ে চরম মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যাভাব।
  • গুরুত্ব: ৮ আগস্ট বোম্বাই থেকে গান্ধীজি ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ স্লোগান দিয়ে এই আন্দোলনের ডাক দেন। শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটি ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দেয় যে তাদের ভারত ছাড়ার সময় এসে গেছে।

১৪. ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ (Do or Die) স্লোগানটির প্রেক্ষাপট কী ছিল?

১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব পাসের সময় গান্ধীজি এই ঐতিহাসিক স্লোগান দেন। ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার পর তিনি বুঝতে পারেন আপসের আর কোনো জায়গা নেই। তাই তিনি দেশবাসীকে ডাক দিয়ে বলেন, “হয় আমরা দেশকে স্বাধীন করব, নয়তো এই প্রচেষ্টায় প্রাণ দেব— কিন্তু পরাধীন হয়ে আর বাঁচব না।”

১৫. সুভাষচন্দ্র বসু কেন ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেছিলেন?

১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে সভাপতি হওয়ার পরও গান্ধীজি ও তাঁর অনুগামীদের প্রবল বিরোধিতার মুখে সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আপসহীন সংগ্রামে বিশ্বাসী সুভাষ বুঝতে পারেন, পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ প্রয়োজন। তাই বামপন্থী ও বিপ্লবী শক্তিকে একজোট করতে তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৬. আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার ও তার প্রভাব কী ছিল?

১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের তিন বীর অফিসার (পি.কে. সেহগল, জি.এস. ধিলোঁ ও শাহনওয়াজ খান)-কে দিল্লির লালকেল্লায় বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এর প্রতিবাদে গোটা ভারতবর্ষে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কংগ্রেস নেতারা তাঁদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়েন এবং নৌ-বিদ্রোহীরাও তাঁদের সমর্থন করেন। প্রবল জনমতের চাপে ব্রিটিশরা তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৭. মহাত্মা গান্ধী কেন খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের খলিফাকে রক্ষার জন্য মুসলিমরা খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করে। গান্ধীজি মনে করেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সবচেয়ে জরুরি। এই ধর্মীয় আন্দোলনকে সমর্থন করার মাধ্যমে তিনি হিন্দু ও মুসলিমদের এক ছাতার তলায় এনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক বিশাল যৌথ গণআন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

১৮. ‘গান্ধী-আরউইন চুক্তি’ কী? এর মূল শর্তগুলি কী ছিল?

১৯৩১ সালের ৫ মার্চ মহাত্মা গান্ধী ও লর্ড আরউইনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শর্ত অনুযায়ী: (১) সরকার সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদের (যাঁদের বিরুদ্ধে হিংসার অভিযোগ নেই) মুক্তি দেবে। (২) উপকূলে লবণ তৈরির অনুমতি দেওয়া হবে। (৩) এর বিনিময়ে কংগ্রেস আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত রাখবে এবং দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেবে।

১৯. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কেন গান্ধীজির অহিংসার পথ পুরোপুরি মেনে নেননি?

নেতাজি মনে করতেন, নিষ্ঠুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে কেবল অহিংসা বা নৈতিক আবেদনের মাধ্যমে হারানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন চরম আঘাত ও প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ নীতিতে বিশ্বাস করে জার্মানি ও জাপানের সাহায্য নিয়েছিলেন, যা গান্ধীজির অহিংস নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।

২০. ‘তামলুক জাতীয় সরকার’ কীভাবে কাজ পরিচালনা করত?

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় মেদিনীপুরের তামলুকে সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে ‘তামলুক জাতীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রায় দেড় বছর ধরে নিজস্ব পুলিশ, আদালত এবং সমান্তরাল প্রশাসন চালিয়েছিল। বিশেষ করে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের সময় ব্রিটিশদের সাহায্য ছাড়াই তারা দুর্দান্তভাবে স্থানীয় মানুষদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিল।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (Broad Questions) – মান ৫

১. মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহের আদর্শ ব্যাখ্যা করো। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের তিনটি বড়ো পর্যায় আলোচনা করো।

অহিংস সত্যাগ্রহের আদর্শ: মহাত্মা গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহ’ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আত্মিক ও নৈতিক শক্তির লড়াই। এর তিনটি মূল স্তম্ভ হলো:

  • সত্য: যেকোনো পরিস্থিতিতে সত্যের প্রতি অটল থাকা।
  • অহিংসা: শত্রুকে শারীরিক আঘাত না করে, নিজের আত্মকষ্টের মাধ্যমে শত্রুর বিবেক জাগ্রত করা।
  • গণমুখীতা: বৃহত্তর সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে কঠোর শৃঙ্খলার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

তিনটি বড়ো আন্দোলন:

  1. অসহযোগ আন্দোলন (১৯২১-২২): রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুরু হয়। দেশবাসী ব্রিটিশ স্কুল, কলেজ, আদালত ও বিদেশি দ্রব্য পুরোপুরি বর্জন করে। তবে চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার পর এটি প্রত্যাহার করা হয়।
  2. আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-৩৪): ঐতিহাসিক ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে লবণ আইন ভঙ্গ করে এই আন্দোলনের সূচনা। এতে নারী সমাজ ও কৃষকরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং কর দেওয়া বন্ধ করে দেন।
  3. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২): এটি ছিল ব্রিটিশদের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি। ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া এই স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করে দেয় যে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান আসন্ন।

২. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি, প্রকৃতি ও গুরুত্ব আলোচনা করো। তামলুক জাতীয় সরকার কীভাবে কাজ করেছিল?

  • পটভূমি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের সম্মতি ছাড়াই ভারতীয় সেনাকে ব্যবহার, চরম অর্থনৈতিক সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ-বিরোধী ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
  • প্রকৃতি: ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট গান্ধীজি আন্দোলনের ডাক দেন। পরের দিনই সমস্ত বড়ো নেতা গ্রেপ্তার হয়ে যান। ফলে এটি একটি নেতৃত্বহীন, স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ থানা, পোস্ট অফিস, রেললাইন আক্রমণ করে ব্রিটিশ প্রশাসনকে অচল করে দেয়।
  • তামলুক জাতীয় সরকার: মেদিনীপুরের তামলুকে সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে গঠিত ‘তামলুক জাতীয় সরকার’ এক অনন্য নজির স্থাপন করে। তারা নিজস্ব আদালত গঠন করে, ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিলি করে এবং সশস্ত্র বিদ্যুৎ বাহিনী তৈরি করে প্রায় দেড় বছর সমান্তরাল প্রশাসন চালিয়েছিল। এই আন্দোলনে ৭৩ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মবলিদান আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।

৩. সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক জীবন, আদর্শ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা আলোচনা করো।

  • রাজনৈতিক জীবন ও আদর্শ: আইসিএস (ICS) ত্যাগ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশদের কাছে আবেদন-নিবেদন করে স্বাধীনতা মিলবে না; প্রয়োজন সশস্ত্র ও আপসহীন সংগ্রাম। গান্ধীজির সাথে আদর্শগত বিরোধের কারণে কংগ্রেস সভাপতির পদ ছেড়ে তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন।
  • আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে তিনি দেশের বাইরে গিয়ে সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে এই ফৌজ ১৯৪৪ সালে ভারতের মাটিতে (ইম্ফল ও কোহিমা) জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। নারীদের নিয়ে তিনি গঠন করেন ‘রানি ঝাঁসি বাহিনী’। সামরিকভাবে চূড়ান্ত জয় না পেলেও, আজাদ হিন্দ ফৌজের আত্মত্যাগ ও পরবর্তীকালে লালকেল্লায় তাদের বিচার দেশজুড়ে যে অভূতপূর্ব গণজাগরণ তৈরি করেছিল, তা ব্রিটিশ শাসনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

৪. মহাত্মা গান্ধী ও সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্যগুলি কী কী ছিল? ত্রিপুরী অধিবেশনে (১৯৩৯) এটি কীভাবে প্রকট হয়?

  • আদর্শগত পার্থক্য:
    • সংগ্রামের পথ: গান্ধীজি ছিলেন সম্পূর্ণ অহিংস সত্যাগ্রহে বিশ্বাসী। অন্যদিকে, সুভাষচন্দ্র প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ ও সশস্ত্র সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষপাতী ছিলেন।
    • আন্দোলনের ধরন: গান্ধীজি চাইতেন পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন (আন্দোলন, তারপর বিরতি ও গঠনমূলক কাজ)। সুভাষচন্দ্র একটানা ও চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থান চাইতেন।
    • বিদেশি সাহায্য: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সুভাষচন্দ্র ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ নীতিতে বিশ্বাস করে জার্মানি ও জাপানের সাহায্য নেন, যা গান্ধীজির নীতিবিরুদ্ধ ছিল।
  • ত্রিপুরী অধিবেশন (১৯৩৯): এই আদর্শগত বিরোধের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেসে। সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে সভাপতি হন। কিন্তু কার্যনির্বাহী সমিতির অসহযোগিতায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং নতুন দল ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন।

৫. আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কী প্রভাব ফেলেছিল? নৌ-বিদ্রোহের সাথে এর সম্পর্ক কী?

  • INA-এর বিচার ও গণজাগরণ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি তিন অফিসারকে দিল্লির লালকেল্লায় বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এর প্রতিবাদে গোটা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। জওহরলাল নেহরু সহ শীর্ষ আইনজীবীরা তাঁদের হয়ে লড়েন। এই বিচার প্রমাণ করে যে দেশের সাধারণ মানুষ এবং সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে।
  • নৌ-বিদ্রোহের সাথে সম্পর্ক: আইএনএ (INA) বন্দিদের মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে চলা আন্দোলনের আঁচ গিয়ে পড়ে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীতেও। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বোম্বাই বন্দরে নৌ-সেনারা বিদ্রোহ করেন, যা ‘রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এই জোড়া ধাক্কায় ব্রিটিশরা স্পষ্ট বুঝে যায় যে, ভারতীয় সেনার ওপর ভরসা করে আর দেশ শাসন করা সম্ভব নয়।

৬. বিংশ শতকের শুরুতে বিপ্লবী কার্যকলাপ কীভাবে বিকশিত হয়েছিল? মাস্টারদা, ভগৎ সিং এবং বিনয়-বাদল-দীনেশের অবদান লেখো।

কংগ্রেসের নরমপন্থী রাজনীতির ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে বিংশ শতকের শুরুতে বাংলার ও ভারতের যুবসমাজ সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেয়।

  • সূর্য সেন (মাস্টারদা): ১৯৩০ সালে তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে কাঁপিয়ে দেয়। জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ ভারতীয় বিপ্লবী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
  • ভগৎ সিং: তিনি ছিলেন বিপ্লবী আন্দোলনের সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রতীক। স্যান্ডার্স হত্যা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ— তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ব্রিটিশদের ভীত করার জন্য। হাসিমুখে তাঁর ফাঁসির দড়ি বরণ করা যুবসমাজকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
  • বিনয়-বাদল-দীনেশ: ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর এই তিন অকুতোভয় তরুণ ইউরোপীয় পোশাকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ঢুকে অত্যাচারী ব্রিটিশ অফিসার সিম্পসনকে হত্যা করেন। এই তিনজনের আত্মবলিদান প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয় বিপ্লবীরা মৃত্যুকে ভয় পায় না।

৭. ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা আলোচনা করো। রানি ঝাঁসি বাহিনী ও মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান উল্লেখ করো।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল পুরুষদের লড়াই ছিল না। অহিংস আন্দোলন থেকে শুরু করে সশস্ত্র বিপ্লব— সর্বত্র নারীদের গৌরবময় ভূমিকা ছিল।

  • রানি ঝাঁসি বাহিনী: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নারীদের সামরিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন। তাই আজাদ হিন্দ ফৌজে তিনি ‘রানি ঝাঁসি বাহিনী’ নামে একটি স্বতন্ত্র মহিলা সেনাদল গঠন করেন। প্রায় ১৩০০ নারী সৈনিক কাঁধে বন্দুক তুলে নিয়ে বার্মা ফ্রন্টে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছিলেন।
  • মাতঙ্গিনী হাজরা: ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের তমলুকে এক বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ৭৩ বছর বয়সী বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা। পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মুহূর্তেও তিনি হাত থেকে ভারতের তেরঙা পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি।

৮. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের বিবর্তন আলোচনা করো।

এই সময়ের মধ্যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন আবেদন-নিবেদন থেকে সরাসরি গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়েছিল:

  • প্রথম পর্ব (অহিংস গণআন্দোলন): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাওলাট আইনের প্রতিবাদে গান্ধীজির হাত ধরে কংগ্রেসের আন্দোলন সম্পূর্ণ গণমুখী হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ছিল এর প্রথম বড় প্রমাণ।
  • দ্বিতীয় পর্ব (আইন অমান্য ও বিপ্লবী ধারা): ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ আইন সরাসরি ভঙ্গ করা শুরু হয়। একই সময়ে মাস্টারদা সূর্য সেন ও ভগৎ সিংয়ের মতো তরুণদের হাত ধরে সশস্ত্র বিপ্লবী ধারা চরমে পৌঁছায়।
  • চূড়ান্ত পর্ব (ভারত ছাড়ো ও আজাদ হিন্দ): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে শুরু হয় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন, যা ছিল আপসহীন। এরপর নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহ ব্রিটিশদের সামরিক শক্তির অহংকার ভেঙে চুরমার করে দেয়, যার পরিণতি হলো ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা।

একনজরে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

  • চম্পারণ সত্যাগ্রহ
    ১৯১৭
    বিহারের চম্পারণে নীলচাষীদের ওপর শোষণের বিরুদ্ধে ভারতে গান্ধীজির প্রথম সফল অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন।
  • রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড
    ১৯১৯
    বিনা বিচারে বন্দি রাখার কালাকানুন (রাওলাট আইন) পাস এবং ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরীহ জনতার ওপর ব্রিটিশ পুলিশের বর্বরোচিত গুলিচালনা।
  • অসহযোগ আন্দোলন
    ১৯২১ – ১৯২২
    গান্ধীজির নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকার ও তাদের সমস্ত প্রতিষ্ঠান বর্জনের বৃহত্তর গণআন্দোলন, যা চৌরিচৌরার ঘটনার পর প্রত্যাহৃত হয়।
  • আইন অমান্য আন্দোলন ও ডান্ডি অভিযান
    ১৯৩০
    গান্ধীজির ঐতিহাসিক লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা। একই বছরে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন।
  • ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন
    ১৯৩৯
    কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনে মতবিরোধের জেরে সভাপতির পদ ত্যাগ করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নতুন রাজনৈতিক দল গঠন।
  • ভারত ছাড়ো আন্দোলন
    ১৯৪২
    ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ স্লোগান নিয়ে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার চরম হুঁশিয়ারি প্রদান এবং দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহ।
  • আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা
    ১৯৪৩
    সিঙ্গাপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার ও আজাদ হিন্দ ফৌজের পুনর্গঠন।
  • রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ
    ১৯৪৬
    বোম্বাইয়ে নৌ-সেনাদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ, যা ব্রিটিশ সামরিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দেয় এবং ভারতের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করে।

Leave a Comment