WBBSE Class 8 History Chapter 4 ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও দরিদ্রতা Question And Answers

Class 8 History Chapter 4 Question And Answers

এই অধ্যায়ে ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা, কৃষকদের দুর্দশা, দেশীয় শিল্পের পতন এবং সম্পদের বহির্গমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি আলোচনা করা হয়েছে। এখানে WBBSE Class 8 History Chapter 4 ‘ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও দরিদ্রতা’-এর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর সহজ ভাষায় দেওয়া হলো, যাতে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই পড়তে ও বুঝতে পারে।

MCQ – বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (২৯টি)

১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কে এবং কত সালে প্রবর্তন করেন?

ক) ওয়ারেন হেস্টিংস, ১৭৭২ সালে খ) লর্ড কর্নওয়ালিস, ১৭৯৩ সালে গ) লর্ড ওয়েলেসলি, ১৭৯৮ সালে ঘ) লর্ড ডালহৌসি, ১৮৪৮ সালে

উত্তর: খ) লর্ড কর্নওয়ালিস, ১৭৯৩ সালে।

ব্যাখ্যা: ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এই ব্যবস্থায় জমিদারদের জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং কোম্পানিকে দেওয়ার রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়।

২. রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

ক) জমিদারদের সঙ্গে রাজস্ব নির্ধারণ করা খ) সরাসরি কৃষক বা রায়তের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা গ) গ্রামের সমগ্র সমাজের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা ঘ) মিশনারিদের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা

উত্তর: খ) সরাসরি কৃষক বা রায়তের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা।

ব্যাখ্যা: রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় জমিদারদের মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো। কৃষকদের জমির অধিকার দেওয়া হলেও রাজস্বের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব দিতে না পারলে কৃষক জমি হারানোর আশঙ্কায় থাকতেন।

৩. মহলওয়ারি বন্দোবস্ত প্রধানত ভারতের কোন অঞ্চলে চালু হয়েছিল?

ক) বাংলা খ) মাদ্রাজ গ) উত্তর ভারত ঘ) বোম্বাই

উত্তর: গ) উত্তর ভারত।

ব্যাখ্যা: মহলওয়ারি বন্দোবস্ত মূলত উত্তর ভারতে চালু করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় একজন কৃষকের পরিবর্তে গ্রামের প্রধান অথবা সমগ্র গ্রামসমাজের সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করা হতো। তবে এর ফলে সাধারণ কৃষকদের আর্থিক সমস্যার বিশেষ সমাধান হয়নি।

৪. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার অধিকাংশ কৃষকের কী অবস্থা হয়েছিল?

ক) কৃষকদের আর্থিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল খ) অনেক কৃষক জমি হারিয়ে ভাগচাষি বা বর্গাদারে পরিণত হয়েছিলেন গ) কৃষকেরা জমির স্থায়ী মালিক হয়েছিলেন ঘ) কৃষকেরা ইউরোপে চলে গিয়েছিলেন

উত্তর: খ) অনেক কৃষক জমি হারিয়ে ভাগচাষি বা বর্গাদারে পরিণত হয়েছিলেন।

ব্যাখ্যা: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের ক্ষমতা ও সম্পত্তি বাড়লেও সাধারণ কৃষকদের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। বেশি খাজনা ও নানা অতিরিক্ত করের চাপে কৃষকেরা সমস্যায় পড়তেন। সময়মতো খাজনা দিতে না পারলে তাঁদের জমি হারানোর আশঙ্কা থাকত।

৫. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সঙ্গে যুক্ত ‘সূর্যাস্ত আইন’ বলতে কী বোঝায়?

ক) সন্ধ্যার পর কৃষিকাজ বন্ধ রাখার নিয়ম খ) নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে রাজস্ব জমা দিতে না পারলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করার নিয়ম গ) কৃষকদের জমির অধিকার রক্ষার আইন ঘ) বনভূমি সংরক্ষণের আইন

উত্তর: খ) নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে রাজস্ব জমা দিতে না পারলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করার নিয়ম।

ব্যাখ্যা: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি কঠোর শর্ত ছিল সূর্যাস্ত আইন। নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে সম্পূর্ণ রাজস্ব জমা দিতে না পারলে জমিদারের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করা হতো। এই নিয়মের কারণে অনেক পুরোনো জমিদার তাঁদের জমিদারি হারিয়েছিলেন।

৬. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বলতে কী বোঝায়?

ক) শুধু নিজের পরিবারের খাবারের জন্য ফসল উৎপাদন খ) বাজারে বিক্রি বা বিদেশে রপ্তানির জন্য বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন গ) কৃষিজমি অনাবাদি করে রাখা ঘ) কৃষিজমিতে কলকারখানা তৈরি করা

উত্তর: খ) বাজারে বিক্রি বা বিদেশে রপ্তানির জন্য বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন।

ব্যাখ্যা: কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বলতে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাজারে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে নীল, পাট, তুলো ও চায়ের মতো ফসল চাষকে বোঝায়। ব্রিটিশ শাসনকালে এই ধরনের ফসলের চাষ বাড়তে থাকে। এর ফলে অনেক কৃষক নিজেদের প্রয়োজনের খাদ্যশস্য চাষের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

৭. বাংলায় নীল বিদ্রোহ কত সালে সংঘটিত হয়েছিল?

ক) ১৭৭০ সালে খ) ১৮৫৭ সালে গ) ১৮৫৯-৬০ সালে ঘ) ১৮৭৫ সালে

উত্তর: গ) ১৮৫৯-৬০ সালে।

ব্যাখ্যা: ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নীলচাষিরা নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হন। নীলকরদের জোরজবরদস্তি, কম দামে নীল বিক্রি করতে বাধ্য করা এবং অত্যাচারের প্রতিবাদ থেকেই নীল বিদ্রোহের সূচনা হয়।

৮. নীলচাষের ক্ষেত্রে ‘দাদন’ প্রথা কী ছিল?

ক) কৃষকদের ঋণ মকুব করার ব্যবস্থা খ) অগ্রিম টাকা দিয়ে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করার ব্যবস্থা গ) সরকার থেকে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া ঘ) কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ দেওয়া

উত্তর: খ) অগ্রিম টাকা দিয়ে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করার ব্যবস্থা।

ব্যাখ্যা: নীলকররা কৃষকদের আগাম কিছু টাকা দিতেন, যা দাদন নামে পরিচিত ছিল। এই টাকা নেওয়ার পর কৃষকদের নির্দিষ্ট জমিতে নীল চাষ করতে হতো। উৎপাদিত নীলের দামও তাঁরা নীলকরদের কাছ থেকে খুব কম পেতেন। ফলে অনেক কৃষক ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতেন না।

৯. অবশিল্পায়ন বলতে কী বোঝায়?

ক) শিল্পের দ্রুত উন্নতি খ) দেশীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ) নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি ঘ) ইউরোপের শিল্পের অবনতি

উত্তর: খ) দেশীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের বহু ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের অবনতি ঘটে। ব্রিটেনের কলকারখানায় তৈরি সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পেরে অনেক দেশীয় শিল্প বন্ধ হয়ে যায়। এই শিল্পের অবনতিকে অবশিল্পায়ন বলা হয়।

১০. ‘সম্পদের বহির্গমন’ তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা কে ছিলেন?

ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খ) দাদাভাই নওরোজি গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ

উত্তর: খ) দাদাভাই নওরোজি।

ব্যাখ্যা: দাদাভাই নওরোজি সম্পদের বহির্গমন তত্ত্বের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর Poverty and Un-British Rule in India গ্রন্থে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের সম্পদ বিভিন্ন উপায়ে ব্রিটেনে চলে যাচ্ছিল।

১১. দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা কত সালে হয়েছিল এবং এর প্রধান কারণ কী ছিল?

ক) ১৮৫৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহ খ) ১৮৭৫ সালে, কৃষকদের ঋণের বোঝা ও মহাজনদের অত্যাচার গ) ১৮৫৯ সালে, নীলচাষের সমস্যা ঘ) ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ

উত্তর: খ) ১৮৭৫ সালে, কৃষকদের ঋণের বোঝা ও মহাজনদের অত্যাচার।

ব্যাখ্যা: ১৮৭৫ সালে দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর তুলোর চাহিদা কমে যাওয়ায় তুলোচাষিরা আর্থিক সংকটে পড়েন। অন্যদিকে, মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করতে না পেরে কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এই পরিস্থিতি থেকেই দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা শুরু হয়।

১২. বাংলার তাঁতশিল্পের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ কী ছিল?

ক) প্রাকৃতিক দুর্যোগ খ) ব্রিটিশদের বাণিজ্যনীতি ও ব্রিটিশ কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা গ) ভারতীয়দের তাঁতশিল্পের প্রতি অনীহা ঘ) মহারাষ্ট্রের তাঁতিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

উত্তর: খ) ব্রিটিশদের বাণিজ্যনীতি ও ব্রিটিশ কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা।

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার তাঁতশিল্প নানা সমস্যার মুখে পড়ে। ব্রিটেনের কারখানায় তৈরি সস্তা কাপড় ভারতীয় বাজারে আসতে শুরু করে। অন্যদিকে, কাঁচা সুতোর দাম, দেশীয় পণ্যের ওপর শুল্ক এবং কোম্পানির বিভিন্ন বাণিজ্যিক নীতির কারণে তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের অবনতি ঘটে।

১৩. বাংলায় প্রথম পাটের কারখানা কোথায় এবং কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?

ক) কলকাতা, ১৮৫০ সালে খ) হুগলির রিষড়া, ১৮৫৫ সালে গ) বোম্বাই, ১৮৫৩ সালে ঘ) মাদ্রাজ, ১৮৬০ সালে

উত্তর: খ) হুগলির রিষড়া, ১৮৫৫ সালে।

ব্যাখ্যা: ১৮৫৫ সালে হুগলি জেলার রিষড়ায় বাংলার প্রথম পাটের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পাট ছিল বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। পরবর্তীকালে হুগলি নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে পাটশিল্পের বিস্তার ঘটে।

১৪. বোম্বাইয়ে প্রথম সুতির কাপড় তৈরির কারখানা কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?

ক) ১৮৫০ সালে খ) ১৮৫৩ সালে গ) ১৮৫৫ সালে ঘ) ১৮৭০ সালে

উত্তর: খ) ১৮৫৩ সালে।

ব্যাখ্যা: ১৮৫৩ সালে বোম্বাইয়ে প্রথম আধুনিক সুতির কাপড় তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারখানার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতে আধুনিক সুতিবস্ত্র শিল্পের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।

১৫. ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে রেলপথ নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

ক) ভারতীয়দের যাতায়াতের সুবিধা বাড়ানো খ) সেনাবাহিনীর চলাচল ও ব্রিটিশ বাণিজ্যের সুবিধা বৃদ্ধি করা গ) দুর্ভিক্ষ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা ঘ) কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি ঘটানো

উত্তর: খ) সেনাবাহিনীর চলাচল ও ব্রিটিশ বাণিজ্যের সুবিধা বৃদ্ধি করা।

ব্যাখ্যা: ভারতে রেলপথ নির্মাণের পিছনে ব্রিটিশদের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছিল। রেলপথের সাহায্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সেনাবাহিনী দ্রুত পাঠানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে কাঁচামাল বন্দরে নিয়ে যাওয়া এবং ব্রিটিশ পণ্য দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দেওয়াও সহজ হয়েছিল।

১৬. লর্ড ডালহৌসির আমলে রেলপথ নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

ক) পর্যটন শিল্পের উন্নতি করা খ) দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠানো গ) কৃষকদের যাতায়াতের সুবিধা করা ঘ) তীর্থস্থানগুলির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা

উত্তর: খ) দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠানো।

ব্যাখ্যা: লর্ড ডালহৌসির আমলে ভারতে রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রয়োজনে দ্রুত সেনাবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি বাণিজ্যিক কাজেও রেলপথ ব্যবহার করা হতো।

১৭. ভারতে প্রথম টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা কত সালে চালু হয়?

ক) ১৮৫১ সালে খ) ১৮৫৩ সালে গ) ১৮৫৭ সালে ঘ) ১৮৬৫ সালে

উত্তর: ক) ১৮৫১ সালে।

ব্যাখ্যা: ১৮৫১ সালে ভারতে প্রথম টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে দূরবর্তী স্থানে দ্রুত সংবাদ পাঠানো সম্ভব হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং বাণিজ্যিক কাজে এই যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৮. বাংলায় নীলচাষের উৎপাদিত নীল মূলত কোন দেশের শিল্পের চাহিদা মেটাত?

ক) ভারতের বাজার খ) ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্প গ) চিনের বাজার ঘ) আফ্রিকার বাজার

উত্তর: খ) ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্প।

ব্যাখ্যা: বাংলায় উৎপাদিত নীলের একটি বড়ো অংশ ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হতো। ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পে কাপড় রং করার জন্য নীলের প্রয়োজন ছিল। পরে কৃত্রিম নীল তৈরি শুরু হলে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা কমে যায়।

১৯. ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী’ বলতে কাদের বোঝানো হয়?

ক) ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদদের খ) যেসব ভারতীয় ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেছিলেন গ) ধনী জমিদারদের ঘ) ইউরোপীয় বণিকদের

উত্তর: খ) যেসব ভারতীয় ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেছিলেন।

ব্যাখ্যা: দাদাভাই নওরোজি ও রমেশচন্দ্র দত্তের মতো চিন্তাবিদেরা ভারতের দারিদ্র্যের জন্য ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করেছিলেন। তাঁরা সম্পদের বহির্গমন, দেশীয় শিল্পের অবনতি এবং কৃষকদের দুরবস্থার মতো বিষয়গুলি তুলে ধরেন। তাঁদের এই চিন্তাধারার সঙ্গে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ যুক্ত।

২০. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছিলেন?

ক) উন্নতির পথ খ) বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত গ) কৃষকদের মুক্তির সনদ ঘ) বাংলার স্বর্ণযুগ

উত্তর: খ) বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।

ব্যাখ্যা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, এই বন্দোবস্ত বাংলার অবনতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি এই ব্যবস্থার ফলে বাংলার কৃষকসমাজের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

২১. মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অধিকাংশ অঞ্চলে কোন রাজস্ব ব্যবস্থা চালু হয়েছিল?

ক) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত খ) রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত গ) মহলওয়ারি বন্দোবস্ত ঘ) দশসালা বন্দোবস্ত

উত্তর: খ) রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত।

ব্যাখ্যা: মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন অঞ্চলে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত চালু করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। জমিদারদের পরিবর্তে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি বন্দোবস্ত করাই ছিল এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

২২. উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতে রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় কত মাইল হয়েছিল?

ক) ১৮৫৭ সালে খ) ১৮৭০ সালে গ) প্রায় ৫২,৯০০ মাইল ঘ) ১৯০৫ সালে

উত্তর: গ) প্রায় ৫২,৯০০ মাইল।

ব্যাখ্যা: উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতে রেলপথের বিস্তার অনেক বেড়ে যায়। রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫২,৯০০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এই যোগাযোগব্যবস্থা ব্রিটিশদের বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২৩. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুযায়ী জমিদার নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব দিতে না পারলে কী হতো?

ক) জমিদারকে কারাগারে পাঠানো হতো খ) জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হতো গ) রাজস্ব মকুব করে দেওয়া হতো ঘ) কৃষকদের শাস্তি দেওয়া হতো

উত্তর: খ) জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হতো।

ব্যাখ্যা: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব জমা দিতে হতো। নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হলে সূর্যাস্ত আইনের অধীনে তাঁদের জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হতে পারত। এর ফলে বহু জমিদার তাঁদের সম্পত্তি হারিয়েছিলেন।

২৪. ব্রিটিশ শাসনকালে কোন ফসলের চাষে ইউরোপীয় নীলকররা সরাসরি উদ্যোগ নিয়েছিলেন?

ক) তাঁতশিল্প খ) নীলচাষ গ) কাগজশিল্প ঘ) চর্মশিল্প

উত্তর: খ) নীলচাষ।

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ শাসনকালে ইউরোপীয় নীলকররা বাংলায় নীলচাষের প্রসারে সরাসরি উদ্যোগ নেন। তাঁরা নীলচাষের জন্য অগ্রিম টাকা দিতেন এবং কৃষকদের নীল উৎপাদনে উৎসাহিত করতেন। পরে এই ব্যবস্থার সঙ্গে জোরজবরদস্তি ও শোষণ যুক্ত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

২৫. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সাধারণ কৃষকদের জীবনে কী প্রভাব পড়েছিল?

ক) অধিকাংশ কৃষক ধনী হয়ে উঠেছিলেন খ) অনেক কৃষক জমি হারিয়ে কৃষিশ্রমিক বা ভাগচাষিতে পরিণত হয়েছিলেন গ) সব কৃষক শহরে চলে গিয়েছিলেন ঘ) কৃষকেরা কলকারখানার মালিক হয়েছিলেন

উত্তর: খ) অনেক কৃষক জমি হারিয়ে কৃষিশ্রমিক বা ভাগচাষিতে পরিণত হয়েছিলেন।

ব্যাখ্যা: কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে কিছু ব্যবসায়ী ও বড়ো কৃষক লাভবান হলেও অনেক সাধারণ কৃষক আর্থিক সমস্যায় পড়েন। চড়া রাজস্ব, ঋণের বোঝা এবং ফসলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তাঁদের অনেকেই জমি হারান। কেউ কেউ কৃষিশ্রমিক বা ভাগচাষি হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন।

২৬. আসামের চা-বাগানের শ্রমিকদের দুর্দশার কথা ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় কে প্রকাশ করেছিলেন?

ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় খ) দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় গ) রাজা রামমোহন রায় ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তর: খ) দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

ব্যাখ্যা: দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় আসামের চা-বাগানের শ্রমিকদের দুর্দশার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তিনি চা-বাগানে শ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে চা-বাগানের শ্রমিকদের সমস্যার কথা সাধারণ মানুষের সামনে আসে।

২৭. ১৮১৩ সালের চার্টার আইন কার্যকর হওয়ার ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোন অধিকার শেষ হয়?

ক) ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার খ) কোম্পানির অস্তিত্ব গ) ভারতের শাসনব্যবস্থা ঘ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করার অধিকার

উত্তর: ক) ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার।

ব্যাখ্যা: ১৮১৩ সালের চার্টার আইনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার অনেকাংশে শেষ হয়। এর ফলে অন্যান্য ব্রিটিশ বণিকদেরও ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। ব্রিটিশ পণ্যের আমদানি বাড়তে থাকে এবং দেশীয় শিল্পের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বৃদ্ধি পায়।

২৮. অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের বহু শিল্পী ও কারিগরের কী অবস্থা হয়েছিল?

ক) তাঁরা আরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন খ) কাজ হারিয়ে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন গ) তাঁদের বেকারত্ব সম্পূর্ণ দূর হয়েছিল ঘ) তাঁরা ইউরোপের শিল্পের উন্নতি ঘটিয়েছিলেন

উত্তর: খ) কাজ হারিয়ে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন।

ব্যাখ্যা: দেশীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের অবনতির ফলে বহু শিল্পী, তাঁতি ও কারিগর তাঁদের জীবিকা হারান। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁদের অনেকেই কৃষিকাজের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর ফলে কৃষির ওপর মানুষের চাপ বেড়ে যায়।

২৯. ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ভারতকে কীসের সঙ্গে তুলনা করা হতো?

ক) ‘রক্ত’ (Blood) খ) ‘সোনার পাখি’ গ) ‘মস্তিষ্ক’ ঘ) ‘পেশি’

উত্তর: ক) ‘রক্ত’ (Blood)।

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্রিটেনে চলে যেত। ভারতের কাঁচামাল, বাজার এবং রাজস্ব ব্রিটিশ অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবহৃত হতো। এই সম্পদ শোষণের বিষয়টি বোঝাতে ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘রক্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রশ্নে দেওয়া হয়েছে।

পড়াশোনার পরামর্শ: প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর মনে রাখার পাশাপাশি ব্যাখ্যাগুলিও পড়ে নাও। এতে পরীক্ষায় একই বিষয় থেকে অন্যভাবে প্রশ্ন এলেও উত্তর দিতে সুবিধা হবে।

SAQ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (২০টি)

১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী? এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উত্তর: ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এটি ছিল একটি স্থায়ী ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো—

  • জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • জমিদারদের কোম্পানিকে যে রাজস্ব দিতে হতো, তা চিরদিনের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
  • জমিদাররা তাঁদের জমিদারি বিক্রি, হস্তান্তর বা উত্তরাধিকারীদের দিতে পারতেন।
  • নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব জমা দিতে না পারলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হতো।
  • কৃষকদের জমির অধিকার দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাঁরা জমিদারদের অধীনে সাধারণ প্রজায় পরিণত হন।

২. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল ও কুফলগুলি কী ছিল?

উত্তর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কিছু সুবিধা থাকলেও এর ফলে কৃষকদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

সুফল:

  • কোম্পানি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব নিয়মিত পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছিল।
  • জমিদার শ্রেণি ব্রিটিশ শাসনের সমর্থকে পরিণত হয়েছিল।
  • জমিদাররা কৃষির উন্নতির জন্য অর্থ বিনিয়োগ করবেন বলে আশা করা হয়েছিল।

কুফল:

  • কৃষকদের কাছ থেকে বেশি খাজনা আদায় করা হতো।
  • জমিদারদের অত্যাচার ও বেআইনি করের কারণে কৃষকেরা সমস্যায় পড়তেন।
  • সময়মতো রাজস্ব দিতে না পারায় অনেক পুরোনো জমিদার তাঁদের জমিদারি হারান।
  • বহু কৃষক জমি হারিয়ে ভাগচাষি বা বর্গাদারে পরিণত হন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ব্যবস্থাকে ‘বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।

৩. রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত কী? কোথায় এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল?

উত্তর: রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত ছিল এমন একটি ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যেখানে সরকার সরাসরি কৃষক বা রায়তের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন অঞ্চলে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।

এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো—

  • কৃষকদের জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • রাজস্বের পরিমাণ চিরদিনের জন্য নির্দিষ্ট ছিল না। নির্দিষ্ট সময় পর তা পরিবর্তন করা হতো।
  • কৃষকদের ওপর অনেক বেশি রাজস্বের বোঝা চাপানো হতো।
  • সময়মতো রাজস্ব দিতে না পারলে কৃষক জমি হারাতে পারতেন।
  • রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত।

তবে বাস্তবে বেশি রাজস্বের চাপে অনেক কৃষক জমির ওপর তাঁদের অধিকার ধরে রাখতে পারেননি।

৪. মহলওয়ারি বন্দোবস্ত কী? এর বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উত্তর: মহলওয়ারি বন্দোবস্ত ছিল একটি ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যা প্রধানত উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চালু হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় একজন কৃষকের পরিবর্তে সমগ্র গ্রাম বা গ্রামের প্রধানের সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করা হতো।

এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো—

  • একটি গ্রাম বা মহলকে রাজস্ব আদায়ের একক হিসেবে ধরা হতো।
  • গ্রামের প্রধান বা সমগ্র গ্রামসমাজ রাজস্ব দেওয়ার দায়িত্ব নিত।
  • রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ী ছিল না। নির্দিষ্ট সময় পর তা পুনর্নির্ধারণ করা হতো।
  • রাজস্বের হার বেশি হওয়ায় কৃষকদের ওপর আর্থিক চাপ পড়ত।
  • গ্রামের সবাই রাজস্ব দেওয়ার জন্য দায়ী থাকায় একজন কৃষকের সমস্যার প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়তে পারত।

৫. তিন ধরনের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে কোনটি কৃষকদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল?

উত্তর: চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি— তিনটি ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থারই মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির রাজস্ব আদায় বাড়ানো। প্রতিটি ব্যবস্থাতেই কৃষকেরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে বেশি খাজনা আদায় করা হতো। রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব নিত। অন্যদিকে, মহলওয়ারি ব্যবস্থায় গ্রামের প্রধান বা সমগ্র গ্রামকে রাজস্ব দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হতো।

তাই তিনটি ব্যবস্থার মধ্যে একটিকে সব অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বলা কঠিন। তবে প্রতিটি ব্যবস্থাতেই বেশি রাজস্বের চাপ এবং জমি হারানোর আশঙ্কা কৃষকদের দুর্দশা বাড়িয়েছিল।

৬. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ কী? এর প্রভাবগুলি লেখো।

উত্তর: কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বলতে নিজের খাবারের জন্য ফসল উৎপাদনের পরিবর্তে বাজারে বিক্রি বা বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ফসল চাষ করাকে বোঝায়। ব্রিটিশ শাসনকালে নীল, পাট, তুলো ও চায়ের মতো বাণিজ্যিক ফসলের চাষ বাড়তে থাকে।

এর প্রভাবগুলি হলো—

  • অনেক কৃষক খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ফসল চাষ করতে বাধ্য হন।
  • বাজারে ফসলের দাম কমে গেলে কৃষকেরা আর্থিক সংকটে পড়তেন।
  • ঋণ ও রাজস্বের চাপে অনেক কৃষক জমি হারিয়ে কৃষিশ্রমিক বা ভাগচাষিতে পরিণত হন।
  • কৃষির উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও উপকরণ না থাকায় সাধারণ কৃষকেরা পিছিয়ে পড়েন।
  • কৃষকদের অসন্তোষের ফলে নীল বিদ্রোহ ও দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামার মতো আন্দোলন দেখা দেয়।

৭. নীল বিদ্রোহ কেন হয়েছিল? এর ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলার কৃষকেরা নীলকরদের অত্যাচার ও জোর করে নীলচাষ করানোর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করেন, তা নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

বিদ্রোহের কারণ:

  • নীলকররা কৃষকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে নীলচাষ করতে বাধ্য করতেন।
  • কৃষকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের জমিতে নীল চাষ করানো হতো।
  • উৎপাদিত নীলের জন্য কৃষকেরা খুব কম দাম পেতেন।
  • ঋণ শোধ করতে না পারায় কৃষকেরা দীর্ঘদিন নীলকরদের নিয়ন্ত্রণে থাকতেন।

বিদ্রোহের ফলাফল: কৃষকদের আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করলে ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের তদন্তের পর জোর করে নীলচাষ করানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই বিদ্রোহ বাংলার কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

৮. দাদন প্রথা কী? কৃষকদের ওপর এর কী প্রভাব পড়েছিল?

উত্তর: নীলকররা নীলচাষের জন্য কৃষকদের যে অগ্রিম টাকা দিতেন, তা দাদন নামে পরিচিত ছিল। এই টাকা নেওয়ার পর কৃষকদের নির্দিষ্ট জমিতে নীল চাষ করতে হতো এবং উৎপাদিত নীল নীলকরদের কাছে বিক্রি করতে হতো।

দাদন প্রথার ফলে কৃষকদের নানা সমস্যা দেখা দেয়—

  • অগ্রিম টাকা নেওয়ার কারণে কৃষকেরা ঋণের ফাঁদে আটকে পড়তেন।
  • নিজেদের ইচ্ছামতো খাদ্যশস্য চাষ করার সুযোগ অনেক সময় পেতেন না।
  • উৎপাদিত নীলের দাম কম হওয়ায় ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ত।
  • ঋণ শোধ করতে না পারলে কৃষকদের জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কা থাকত।
  • নীলকরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কৃষকেরা ১৮৫৯-৬০ সালে বিদ্রোহ করেন।

৯. দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা কী? এর কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১৮৭৫ সালে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির পুনা, আহমদনগর প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষকেরা মহাজনদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করেন, তা দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা নামে পরিচিত।

এই আন্দোলনের প্রধান কারণগুলি ছিল—

  • আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তুলোর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাক্ষিণাত্যে তুলো চাষ বৃদ্ধি পায়।
  • গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তুলোর দাম কমে যায়। ফলে কৃষকেরা আর্থিক সমস্যায় পড়েন।
  • বেশি রাজস্ব এবং খরার কারণে কৃষকদের দুরবস্থা আরও বাড়ে।
  • ঋণ শোধ করতে না পারায় কৃষকেরা মহাজনদের কাছে জমি বন্ধক রাখতে বাধ্য হতেন।
  • মহাজনদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষকেরা তাঁদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁরা ঋণের দলিলপত্র পুড়িয়ে দেন এবং মহাজনদের বর্জন করেন।

এই আন্দোলনের পর কৃষকদের ঋণসংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় ১৮৭৯ সালে দাক্ষিণাত্য কৃষক ত্রাণ আইন পাস করা হয়।

১০. অবশিল্পায়ন কী? বাংলার তাঁতশিল্প কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল?

উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের ক্রমশ অবনতি ঘটাকে অবশিল্পায়ন বলা হয়।

বাংলার তাঁতশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো—

  • ইংল্যান্ডের কারখানায় তৈরি সস্তা কাপড় ভারতীয় বাজারে আসায় দেশীয় তাঁতিরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
  • কাঁচা সুতোর দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁতিদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়।
  • অনেক ক্ষেত্রে তাঁতিরা তাঁদের তৈরি কাপড়ের ন্যায্য দাম পেতেন না।
  • ব্রিটিশ পণ্যের আমদানি ও ভারতীয় পণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক শুল্কনীতি দেশীয় শিল্পের ক্ষতি করে।
  • এসব কারণে বাংলার তাঁতশিল্পের অবনতি ঘটে। বহু তাঁতি ও কারিগর জীবিকা হারান।

১১. সম্পদের বহির্গমন বা Drain of Wealth বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারত থেকে বিভিন্ন উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্রিটেনে চলে যেত। এই সম্পদ স্থানান্তরের ফলে ভারতের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ দাদাভাই নওরোজি এই বিষয়টিকে সম্পদের বহির্গমন বা Drain of Wealth হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

সম্পদ বহির্গমনের কয়েকটি প্রধান উপায় ছিল—

  • ব্রিটিশ কর্মচারীদের বেতন ও পেনশনের টাকা ভারত থেকে ব্রিটেনে পাঠানো হতো।
  • ভারতীয় রাজস্বের অর্থ দিয়ে ব্রিটেন থেকে বিভিন্ন সামগ্রী কেনা হতো।
  • ভারতে রেলপথ নির্মাণে বিনিয়োগকারী ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিকে সুদ দিতে হতো।
  • চা-বাগান ও অন্যান্য শিল্প থেকে অর্জিত মুনাফার একটি বড়ো অংশ ব্রিটেনে চলে যেত।

দাদাভাই নওরোজি মনে করতেন, এই সম্পদ বহির্গমন ভারতের দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ।

১২. ঔপনিবেশিক ভারতে রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্য ও ফলাফল কী ছিল?

উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে রেলপথ নির্মাণের পিছনে প্রধানত সামরিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল।

উদ্দেশ্য:

  • এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠানো।
  • কাঁচামাল উৎপাদনের অঞ্চলগুলিকে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা।
  • ব্রিটিশ পণ্য ভারতের বিভিন্ন বাজারে সহজে পৌঁছে দেওয়া।
  • পণ্য আমদানি ও রপ্তানির কাজ দ্রুত করা।

ফলাফল:

  • রেলপথের ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হয়।
  • দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়।
  • ব্রিটিশ পণ্য ভারতের বাজারে সহজে পৌঁছতে শুরু করে।
  • কাঁচামাল দ্রুত বন্দরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
  • রেলপথ নির্মাণের ফলে কিছু অঞ্চলে পরিবেশের ক্ষতি এবং মানুষের স্থানচ্যুতির মতো সমস্যাও দেখা দেয়।

১৩. ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা কেন চালু করা হয়েছিল? এর গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: ব্রিটিশ সরকার মূলত প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু করেছিল। ১৮৫১ সালে ভারতে প্রথম টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হয়।

এর গুরুত্ব ছিল—

  • দূরবর্তী স্থানে দ্রুত সংবাদ পাঠানো সম্ভব হয়।
  • ব্রিটিশ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়।
  • সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্রুত খবর আদান-প্রদান করা যেত।
  • ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশরা টেলিগ্রাফের সাহায্যে বিভিন্ন অঞ্চলের খবর পেয়েছিল।
  • ব্যবসায়ীরা বাজার ও পণ্যের দাম সম্পর্কে দ্রুত খবর পেতে পারতেন।

১৮৭০ সালে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে টেলিগ্রাফ যোগাযোগ চালু হয়। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও দ্রুত হয়।

১৪. সূর্যাস্ত আইন কী? এই আইনের সমালোচনার কারণগুলি লেখো।

উত্তর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে জমিদারদের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে সম্পূর্ণ রাজস্ব জমা দিতে হতো। তা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হতো। এই নিয়মই সূর্যাস্ত আইন নামে পরিচিত।

এই আইনের সমালোচনার কারণগুলি হলো—

  • নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব দিতে না পারলে জমিদারদের জমিদারি হারাতে হতো।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসল নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও রাজস্ব আদায়ের কঠোর নিয়ম কার্যকর থাকত।
  • এই আইনের ফলে অনেক পুরোনো জমিদার পরিবার জমিদারি হারায়।
  • নতুন ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণির হাতে অনেক জমিদারি চলে যায়।
  • এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকদের ওপরও নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়।

১৫. ভারতীয় হস্তশিল্পের অবনতিতে ব্রিটেনের শুল্কনীতি কী ভূমিকা নিয়েছিল?

উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে এমন এক শুল্কনীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যার ফলে ব্রিটিশ শিল্পজাত পণ্য ভারতের বাজারে সহজে বিক্রি হতে পারত। অন্যদিকে, ভারতীয় পণ্য ব্রিটেনে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হতো।

এই শুল্কনীতির প্রভাবগুলি ছিল—

  • ব্রিটেনে ভারতীয় তৈরি কাপড়ের ওপর বেশি শুল্ক বসানো হতো।
  • ব্রিটিশ কারখানায় তৈরি কাপড় ভারতে তুলনামূলকভাবে কম শুল্কে প্রবেশ করতে পারত।
  • ফলে ব্রিটিশ কাপড় ভারতীয় বাজারে সহজে বিক্রি হতো।
  • দেশীয় তাঁতিরা ব্রিটিশ পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারতেন না।
  • এর ফলে ভারতীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের অবনতি ঘটে।

১৬. উনিশ শতকে ভারতে বারবার দুর্ভিক্ষ হওয়ার কারণ কী ছিল? দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা কেমন ছিল?

উত্তর: উনিশ শতকে ভারতে একাধিক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। এর পিছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও প্রভাব ছিল।

দুর্ভিক্ষের কারণ:

  • কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অনেক অঞ্চলে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ফসলের চাষ বাড়ে।
  • কৃষকদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করা হতো। ফলে দুর্ভিক্ষের সময় তাঁদের হাতে সঞ্চিত অর্থ থাকত না।
  • খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ফসল নষ্ট হলে খাদ্যসংকট দেখা দিত।
  • অনেক অঞ্চলে সেচ ও জল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।

সরকারের ভূমিকা: দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য ও ত্রাণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্রিটিশ সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল না। রাজস্ব আদায়ের চাপ এবং খাদ্য সরবরাহের সমস্যায় সাধারণ মানুষ আরও দুর্দশার মধ্যে পড়তেন।

১৭. ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রেক্ষিতে ভারতকে ‘রক্ত’ বলা হতো কেন?

উত্তর: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ভারতের সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ভারত থেকে কাঁচামাল, রাজস্ব ও অন্যান্য সম্পদ ব্রিটেনে পাঠানো হতো। ব্রিটিশ শিল্প ও বাণিজ্যের স্বার্থে ভারতীয় সম্পদ ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ভারতকে সাম্রাজ্যের ‘রক্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো।

এর প্রধান কারণগুলি হলো—

  • ভারত থেকে ব্রিটেনে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল পাঠানো হতো।
  • ভারতীয় রাজস্বের অর্থ ব্রিটিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হতো।
  • ভারতীয় বাজারে ব্রিটিশ শিল্পজাত পণ্য বিক্রি করা হতো।
  • ভারত থেকে অর্জিত মুনাফার একটি বড়ো অংশ ব্রিটেনে চলে যেত।

এর ফলে ভারতের সম্পদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল রাখতে সাহায্য করত।

১৮. উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে গড়ে ওঠা কয়েকটি আধুনিক শিল্পের পরিচয় দাও।

উত্তর: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে ধীরে ধীরে আধুনিক যন্ত্রচালিত শিল্পের প্রসার ঘটতে থাকে। এই সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প গড়ে ওঠে।

  • সুতিবস্ত্র শিল্প: ১৮৫৩ সালে বোম্বাইয়ে প্রথম আধুনিক সুতির কাপড়ের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • পাটশিল্প: ১৮৫৫ সালে হুগলি জেলার রিষড়ায় প্রথম পাটের কারখানা চালু হয়।
  • কয়লাশিল্প: রানিগঞ্জ ও অন্যান্য অঞ্চলে কয়লা উত্তোলনের কাজ বাড়তে থাকে।
  • চা শিল্প: আসাম, দার্জিলিংসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চা-বাগান গড়ে ওঠে।
  • অন্যান্য শিল্প: পরবর্তীকালে চিনি, চামড়া এবং লৌহ-ইস্পাত শিল্পেরও বিকাশ ঘটে।

তবে এই শিল্পগুলির অনেকগুলিতে ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের প্রভাব ছিল বেশি। সুতিবস্ত্র শিল্পে ভারতীয় উদ্যোগপতিরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

১৯. ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতের কৃষি ও শিল্পের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল কেন?

উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের কৃষি ও শিল্পের মধ্যে আগের ভারসাম্য ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এর প্রধান কারণগুলি ছিল—

  • ব্রিটিশ পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের অবনতি ঘটে।
  • বহু শিল্পী ও কারিগর কাজ হারিয়ে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
  • কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অনেক কৃষক খাদ্যশস্যের বদলে নীল, তুলো ও পাটের মতো ফসল চাষ করতে থাকেন।
  • বেশি রাজস্ব ও ঋণের চাপে কৃষকদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • দেশীয় শিল্পের অবনতি এবং কৃষির ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।

ফলে ভারত ক্রমশ ব্রিটিশ শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং তৈরি পণ্যের বাজারে পরিণত হয়।

২০. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সমালোচনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রমেশচন্দ্র দত্তের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রমেশচন্দ্র দত্ত দুজনেই ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরা হয়। তিনি মনে করতেন, এই ব্যবস্থায় জমিদারদের ক্ষমতা বাড়লেও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কঠোর সমালোচনা করেন।

রমেশচন্দ্র দত্ত: তাঁর The Economic History of India গ্রন্থে ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি আলোচনা করা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছিলেন, অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় ও ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতির ফলে কৃষকেরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষ ও কৃষকদের দুরবস্থার সঙ্গেও তিনি রাজস্বনীতির সম্পর্ক তুলে ধরেন।

নিচে ৮টি বড়ো প্রশ্নের উত্তর সহজ, সরল ও ছাত্রছাত্রীদের বোঝার মতো ভাষায় নতুনভাবে সাজিয়ে দিলাম। মূল বিষয়গুলো ঠিক রেখে বাক্য ও উপস্থাপনা আলাদা করা হয়েছে, যাতে তোমার ওয়েবসাইটে নিজস্ব লেখার মতো ব্যবহার করতে পারো।

বড়ো প্রশ্নোত্তর (Broad Questions)

১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী? এর শর্ত, উদ্দেশ্য ও ফলাফল আলোচনা করো। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রমেশচন্দ্র দত্তের সমালোচনা উল্লেখ করো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এই ব্যবস্থায় জমিদারদের কাছ থেকে কোম্পানি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করত। রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ীভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে কৃষকদের জমির ওপর অধিকার অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান শর্ত

1. জমিদারদের মালিকানা: জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁরা জমি বিক্রি করতে, অন্যের নামে হস্তান্তর করতে এবং উত্তরাধিকারীদের দিয়ে যেতে পারতেন।

2. নির্দিষ্ট রাজস্ব: জমিদারদের কোম্পানিকে কত টাকা রাজস্ব দিতে হবে, তা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়। ভবিষ্যতে এই রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানোর কথা ছিল না।

3. সূর্যাস্ত আইন: নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে জমিদার রাজস্ব জমা দিতে না পারলে তাঁর জমিদারি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো।

4. কৃষকদের অধিকার: কৃষকদের জমির ওপর স্বাধীন মালিকানা স্বীকৃত হয়নি। তাঁরা জমিদারদের অধীনে প্রজা হিসেবে থেকে যান।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর উদ্দেশ্য

ব্রিটিশ সরকার মনে করেছিল, জমিদারদের জমির স্থায়ী অধিকার দিলে তাঁরা কৃষির উন্নতির জন্য অর্থ খরচ করবেন। পাশাপাশি, অল্প কয়েকজন জমিদারের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করাও সরকারের পক্ষে সহজ হবে। জমিদারদের আর্থিক স্বার্থ ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের সমর্থক হয়ে উঠবেন— এমন ধারণাও ছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলাফল

সুফল: এই ব্যবস্থার ফলে কোম্পানি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়। অন্যদিকে, জমিদারদের একটি প্রভাবশালী শ্রেণি তৈরি হয়, যাদের অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক হয়ে ওঠেন।

কুফল: কৃষকদের জমির অধিকার দুর্বল হয়ে যায়। জমিদাররা অনেক সময় খাজনার পাশাপাশি নানা বেআইনি কর আদায় করতেন। খাজনা দিতে না পারলে কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কা থাকত। জমিদার ও মহাজনের ঋণের চাপে কৃষকদের দুর্দশা আরও বাড়ে। সূর্যাস্ত আইনের কারণে অনেক পুরোনো জমিদার পরিবারও জমিদারি হারায়।

বঙ্কিমচন্দ্র ও রমেশচন্দ্র দত্তের সমালোচনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থায় কৃষকদের কার্যত জমিদারদের হাতে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর The Economic History of India গ্রন্থে ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, জমির রাজস্বব্যবস্থা ও কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ ভারতীয় কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষতি করেছিল।

উপসংহার: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের অধিকার সুরক্ষিত হলেও কৃষকদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়নি। ফলে কৃষক সমাজের ওপর শোষণের বোঝা বেড়ে যায়।

২. রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি বন্দোবস্ত কী? চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সঙ্গে এদের তুলনা করো।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত

রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় ব্রিটিশ সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। এখানে জমিদারদের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা ছিল না। থমাস মুনরো ও আলেকজান্ডার রিড এই ব্যবস্থা চালু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। মাদ্রাজ ও বোম্বাই অঞ্চলে এই ব্যবস্থা বেশি প্রচলিত ছিল।

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত

মহলওয়ারি ব্যবস্থায় সরকার কোনও একজন জমিদারের সঙ্গে নয়, বরং একটি গ্রাম বা গ্রামের জমির মালিকদের গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করত। ‘মহল’ বলতে এখানে একটি গ্রাম বা রাজস্ব নির্ধারণের একককে বোঝানো হয়েছে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ব্যবস্থা চালু হয়।

তিনটি বন্দোবস্তের মধ্যে পার্থক্য

বিষয়চিরস্থায়ী বন্দোবস্তরায়তওয়ারি বন্দোবস্তমহলওয়ারি বন্দোবস্ত
প্রবর্তনের সময়১৭৯৩ সালউনিশ শতকের প্রথম ভাগউনিশ শতকের প্রথম ভাগ
প্রধান ব্যক্তিলর্ড কর্নওয়ালিসথমাস মুনরো ও আলেকজান্ডার রিডহোল্ট ম্যাকেঞ্জি
প্রধান অঞ্চলবাংলা, বিহার ও উড়িষ্যামাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের বিভিন্ন অঞ্চলউত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল
কার সঙ্গে বন্দোবস্তজমিদারসরাসরি কৃষকগ্রাম বা গ্রামের জমির মালিকদের গোষ্ঠী
রাজস্বের পরিমাণস্থায়ীভাবে নির্ধারিতনির্দিষ্ট সময় অন্তর সংশোধননির্দিষ্ট সময় অন্তর সংশোধন
কৃষকের অবস্থাজমিদারের অধীনে প্রজাসরাসরি সরকারের কাছে রাজস্ব দিতে হতোগ্রামের রাজস্বের দায়ে অংশ নিতে হতো
প্রধান সমস্যাজমিদারের শোষণ ও উচ্ছেদের ভয়অতিরিক্ত রাজস্বের চাপগ্রামের উপর সম্মিলিত রাজস্বের দায়

তিনটি বন্দোবস্তের প্রভাব

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদাররা কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খাজনা ও ঋণের চাপে কৃষকদের দুর্দশা বাড়ত।

রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় কৃষকদের সরাসরি সরকারের কাছে রাজস্ব দিতে হতো। জমিদারের মধ্যস্থতা না থাকলেও রাজস্বের চাপ ছিল বেশি। নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব দিতে না পারলে কৃষকদের জমি হারানোর আশঙ্কা থাকত।

মহলওয়ারি ব্যবস্থায় গ্রামের একাধিক জমির মালিক বা গোষ্ঠীর ওপর রাজস্ব দেওয়ার দায় থাকত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের ওপরও এই ব্যবস্থার চাপ পড়ত।

উপসংহার: তিনটি ব্যবস্থারই উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। তবে প্রত্যেক ব্যবস্থায় কৃষকদের সমস্যার ধরন আলাদা ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের মাধ্যমে, রায়তওয়ারিতে সরাসরি সরকারের মাধ্যমে এবং মহলওয়ারিতে গ্রামের সম্মিলিত দায়ের মাধ্যমে কৃষকদের ওপর রাজস্বের চাপ পড়ত।

৩. ভারতের কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ কী? এর ফলে কৃষক সমাজে কী পরিবর্তন এসেছিল? নীল বিদ্রোহ ও দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামার কারণ আলোচনা করো।

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ

আগে ভারতের অধিকাংশ কৃষক নিজেদের ও স্থানীয় মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য ধান, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য চাষ করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে কৃষকদের নীল, পাট, তুলো ও আফিমের মতো বাজারে বিক্রির উপযোগী ফসল চাষের দিকে বেশি ঠেলে দেওয়া হয়। কৃষির এই পরিবর্তনকে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বলা হয়।

ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের শিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করা এবং বিদেশে পণ্য বিক্রি করে লাভ বাড়ানো।

কৃষক সমাজে এর প্রভাব

1. খাদ্যশস্যের চাষ কমে যাওয়া: অনেক কৃষক খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ফসল চাষ করতে বাধ্য হন। ফলে নিজেদের খাদ্যের জন্য তাঁদের বাজারের ওপর নির্ভর করতে হতো।

2. ঋণের বোঝা বৃদ্ধি: বাণিজ্যিক ফসল চাষের জন্য অনেক কৃষক মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতেন। ফসলের দাম কমে গেলে সেই ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ত।

3. জমি হারানোর আশঙ্কা: ঋণ শোধ করতে না পারলে অনেক কৃষক জমি বন্ধক রাখতে বা হারাতে বাধ্য হতেন।

4. কৃষকদের মধ্যে বৈষম্য: কিছু বড়ো কৃষক ও ব্যবসায়ী বাণিজ্যিক ফসল থেকে লাভ করলেও ছোটো কৃষকদের অনেকেই আর্থিক সমস্যায় পড়েন।

5. কৃষক বিদ্রোহ: অতিরিক্ত খাজনা, ঋণ এবং জোর করে ফসল চাষ করানোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ করেন।

নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০)

বাংলার নীলকররা কৃষকদের অগ্রিম টাকা বা ‘দাদন’ দিয়ে নীল চাষে রাজি করাতেন। পরে সেই ঋণের অজুহাতে কৃষকদের নির্দিষ্ট জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো। নীলের দাম কম হওয়ায় কৃষকদের পক্ষে ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ত। অনেক নীলকর কৃষকদের ওপর অত্যাচারও চালাতেন।

এই শোষণের বিরুদ্ধে ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলার কৃষকরা নীল চাষ করতে অস্বীকার করেন এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এই ঘটনাই নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকে নীলচাষিদের দুর্দশার ছবি তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্রোহের পর ১৮৬০ সালে সরকার নীল কমিশন গঠন করে।

দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (১৮৭৫)

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তুলোর চাহিদা ও দাম বেড়ে যাওয়ায় দাক্ষিণাত্যের অনেক কৃষক বেশি লাভের আশায় তুলো চাষ শুরু করেন। এই চাষের জন্য তাঁরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেন।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তুলোর দাম কমে যায়। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতি ও ঋণের বোঝার কারণে কৃষকদের পক্ষে মহাজনদের টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মহাজনরা ঋণ আদায়ের জন্য কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ১৮৭৫ সালে কৃষকরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তাঁরা মহাজনদের বাড়িতে হামলা চালান এবং ঋণের দলিলপত্র পুড়িয়ে দেন। এই ঘটনা দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা নামে পরিচিত।

উপসংহার: কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে কৃষকরা বাজার, মহাজন ও ঔপনিবেশিক রাজস্বব্যবস্থার ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিই নীল বিদ্রোহ ও দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামার মতো কৃষক আন্দোলনের অন্যতম কারণ ছিল।

৪. অবশিল্পায়ন কী? ব্রিটিশ অর্থনৈতিক নীতির ফলে ভারতীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল? বাংলার তাঁতশিল্পের উদাহরণ দাও।

অবশিল্পায়ন

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের বহু পুরোনো হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প ও কুটিরশিল্প ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক শিল্পী ও কারিগর তাঁদের পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করতে বাধ্য হন। এইভাবে দেশীয় শিল্পের পতনকে অবশিল্পায়ন বলা হয়।

ব্রিটিশরা ভারতকে একদিকে নিজেদের তৈরি পণ্যের বাজার এবং অন্যদিকে কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

ভারতীয় শিল্পের পতনের কারণ

1. বৈষম্যমূলক শুল্কনীতি: ব্রিটিশ পণ্য ভারতীয় বাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারত। অন্যদিকে ভারতীয় পণ্য ব্রিটেনে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে নানা শুল্কের বাধার মুখে পড়ত।

2. কাঁচামালের সমস্যা: দেশীয় তাঁতি ও কারিগরদের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে অসুবিধা হতো। অনেক সময় কাঁচামালের দামও বেড়ে যেত।

3. কম দামে পণ্য কেনা: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে অনেক তাঁতিকে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো। এতে তাঁদের লাভ কমে যেত।

4. ব্রিটিশ কারখানার পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা: ব্রিটেনে যন্ত্রের সাহায্যে কম খরচে প্রচুর কাপড় তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। সেই কাপড় ভারতীয় বাজারে আসায় দেশীয় তাঁতশিল্পীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।

বাংলার তাঁতশিল্পের অবস্থা

একসময় বাংলার মসলিন, জামদানি ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কাপড়ের সারা বিশ্বে চাহিদা ছিল। ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ ছিল বাংলার বিখ্যাত বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র।

কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে এই শিল্প নানা সমস্যার মুখে পড়ে। কোম্পানির বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং ব্রিটেনের কারখানায় তৈরি কাপড়ের আমদানির ফলে বাংলার তাঁতিরা ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হন।

১৮১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার অনেকাংশে শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশ পণ্য আরও বেশি পরিমাণে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে থাকে। ফলে বাংলার হাতে বোনা কাপড়ের চাহিদা কমে যায়। অনেক তাঁতি পেশা ছেড়ে কৃষিকাজে যোগ দিতে বাধ্য হন।

উপসংহার: ব্রিটিশ অর্থনৈতিক নীতির ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলার তাঁতশিল্পের পতন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ জীবিকা হারিয়ে অন্য পেশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

৫. সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব কী? দাদাভাই নওরোজির মতে কী কী উপায়ে ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে চলে যেত? এর ফলাফল আলোচনা করো।

সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারত থেকে প্রচুর সম্পদ ইংল্যান্ডে চলে যেত। এই সম্পদের বিনিময়ে ভারত যথাযথ অর্থনৈতিক সুবিধা পেত না। দাদাভাই নওরোজি এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সম্পদের বহির্গমন বা ‘Drain of Wealth’ তত্ত্ব তুলে ধরেন। তাঁর Poverty and Un-British Rule in India গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

যেভাবে ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে চলে যেত

1. প্রশাসনিক ব্যয়: ভারতে কর্মরত বহু ব্রিটিশ কর্মচারীর বেতন, পেনশন ও অন্যান্য খরচ ভারতীয় রাজস্ব থেকে মেটানো হতো। তাঁদের অনেকেই অবসর নেওয়ার পর সেই অর্থ ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতেন।

2. রেলপথের ব্যয়: ভারতে রেলপথ নির্মাণকারী ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিকে নির্দিষ্ট হারে লাভ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এই লাভের অর্থ ভারতীয় রাজস্ব থেকে দেওয়া হতো।

3. সামরিক ব্যয়: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ও বিভিন্ন যুদ্ধের খরচের একটি বড়ো অংশ ভারতের ওপর চাপানো হতো।

4. বাণিজ্য ও অন্যান্য খরচ: ভারতের রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ব্রিটেনের বিভিন্ন পাওনা মেটাতে ব্যবহার করা হতো। এর ফলে সেই অর্থের পুরোটা ভারতের উন্নয়নে কাজে লাগত না।

সম্পদের বহির্গমনের ফলাফল

1. ভারতের দারিদ্র্য বৃদ্ধি: দেশের সম্পদ বাইরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়।

2. শিল্পের উন্নয়নে বাধা: দেশীয় শিল্পের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব দেখা দেয়। ফলে নতুন শিল্প গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

3. কৃষির দুরবস্থা: কৃষি উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত ছিল।

4. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া: দেশের অর্থ দেশের মানুষের উন্নয়নে পর্যাপ্তভাবে ব্যয় না হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

5. জাতীয়তাবাদের বিকাশ: সম্পদের বহির্গমনের বিষয়টি ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের কাছে ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক শোষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

উপসংহার: দাদাভাই নওরোজির সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব ভারতীয় অর্থনীতির ওপর ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন, ভারতের সম্পদ দেশের উন্নয়নে যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছিল না।

৬. ভারতে রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা কখন চালু হয়? এগুলি কীভাবে ব্রিটিশ শাসনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল?

রেলপথের সূচনা

ভারতে প্রথম যাত্রীবাহী রেল চলাচল শুরু হয় ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল। বোম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পথ রেল চলেছিল। লর্ড ডালহৌসির শাসনকালে ভারতে রেলপথের বিস্তার শুরু হয়।

রেলপথ চালুর উদ্দেশ্য

1. সামরিক উদ্দেশ্য: দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সেনা পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। ফলে বিদ্রোহ দমন ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হয়।

2. বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য: দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তুলো, পাট, কয়লা ও অন্যান্য কাঁচামাল বন্দরে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়েছিল।

3. ব্রিটিশ পণ্যের বাজার বৃদ্ধি: রেলপথের মাধ্যমে ব্রিটেনে তৈরি পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

4. প্রশাসনিক সুবিধা: দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা সহজ হয়েছিল।

টেলিগ্রাফের সূচনা

ভারতে ১৮৫১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হয়। পরে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। টেলিগ্রাফের মাধ্যমে অল্প সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে খবর পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

টেলিগ্রাফ চালুর উদ্দেশ্য

1. প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা।

2. সেনাবাহিনীর কাছে জরুরি খবর দ্রুত পৌঁছে দেওয়া।

3. বাণিজ্য ও বাজারের খবর দ্রুত আদান-প্রদান করা।

ঔপনিবেশিক শাসনের হাতিয়ার হিসেবে রেল ও টেলিগ্রাফ

রেলপথ ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও ব্রিটিশ সরকার এগুলিকে নিজেদের শাসন ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল।

রেলপথের মাধ্যমে শোষণ: রেলপথ ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচামাল বন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো। একই সঙ্গে ব্রিটিশ কারখানায় তৈরি পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়। এর ফলে দেশীয় শিল্পের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ে।

সেনা চলাচল: রেলপথের সাহায্যে ব্রিটিশ সেনাদের দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো যেত। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রেও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্রিটিশদের কাজে লাগে।

টেলিগ্রাফের ব্যবহার: বিদ্রোহ বা প্রশাসনিক সমস্যার খবর দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য টেলিগ্রাফ ব্যবহার করা হতো। ফলে ব্রিটিশ সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ও সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিতে পারত।

উপসংহার: রেলপথ ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগের উন্নতি ঘটালেও ঔপনিবেশিক শাসনকালে এগুলি মূলত ব্রিটিশদের প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

৭. সম্পদের বহির্গমন, অবশিল্পায়ন ও দারিদ্র্য— এই তিনটি বিষয় কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল? আলোচনা করো।

ঔপনিবেশিক অর্থনীতির তিনটি সমস্যা

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অর্থনীতিতে সম্পদের বহির্গমন, দেশীয় শিল্পের পতন এবং দারিদ্র্য— এই তিনটি সমস্যা একে অপরের সঙ্গে জড়িত ছিল। দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত ও অন্যান্য অর্থনৈতিক চিন্তাবিদ এই সমস্যাগুলির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছিলেন।

১. সম্পদের বহির্গমন

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের রাজস্বের একটি বড়ো অংশ প্রশাসনিক খরচ, সামরিক ব্যয়, পেনশন এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় করে ইংল্যান্ডে পাঠানো হতো। ফলে ভারতের সম্পদ দেশের উন্নয়নে পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

২. অবশিল্পায়ন

ভারত থেকে সম্পদ বাইরে চলে যাওয়ায় দেশীয় শিল্পের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব দেখা দেয়। এর পাশাপাশি ব্রিটিশ কারখানায় তৈরি কাপড় ও অন্যান্য পণ্য ভারতীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বাংলার তাঁতশিল্পসহ বহু দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিল্পের কাজ হারিয়ে অনেক তাঁতি ও কারিগর জীবিকার জন্য কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন।

৩. দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ

শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ কৃষিকাজে ফিরে আসায় কৃষির ওপর চাপ বাড়ে। অন্যদিকে কৃষকদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করা হতো। অনেক কৃষক খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ফসল চাষ করতেও বাধ্য হন।

এই পরিস্থিতিতে ফসল নষ্ট হলে বা খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গেলে দরিদ্র মানুষের পক্ষে খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ত। ফলে দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে উঠত।

তিনটি সমস্যার পারস্পরিক সম্পর্ক

সম্পদের বহির্গমনের ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কমে যায়। শিল্পের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অনেক মানুষ কাজ হারান। তাঁরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ে। অতিরিক্ত রাজস্ব ও ঋণের বোঝায় কৃষকদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। এইভাবে সম্পদের বহির্গমন, অবশিল্পায়ন ও দারিদ্র্য একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে।

উপসংহার: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে এই তিনটি সমস্যা আলাদা ছিল না। একটির প্রভাব অন্যটির ওপর পড়ত। ফলে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে।

৮. নীল বিদ্রোহের আগে, বিদ্রোহ চলাকালীন এবং বিদ্রোহের পরে কৃষকদের অবস্থা কেমন ছিল? নীলচাষের সঙ্গে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সম্পর্ক আলোচনা করো।

নীলচাষের পটভূমি

ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পে কাপড় রং করার জন্য নীলের চাহিদা ছিল। এই চাহিদা পূরণের জন্য বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নীলচাষ বাড়তে থাকে। ইউরোপীয় নীলকররা কৃষকদের দিয়ে নীল চাষ করিয়ে লাভ করতেন। কিন্তু এই চাষের ফলে কৃষকদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়।

বিদ্রোহের আগে কৃষকদের অবস্থা

1. দাদনের ফাঁদ: নীলকররা কৃষকদের আগাম টাকা দিতেন, যাকে দাদন বলা হতো। পরে সেই টাকা শোধ করার জন্য কৃষকদের নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো।

2. জোর করে নীলচাষ: অনেক কৃষক নিজেদের ইচ্ছায় নীল চাষ করতে চাইতেন না। তবুও তাঁদের জমির একটি অংশে নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো।

3. কম দাম: নীল চাষ করে কৃষকরা যে পরিমাণ অর্থ পেতেন, তা অনেক সময় উৎপাদনের খরচ ও ঋণ মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।

4. অত্যাচার: নীল চাষ করতে অস্বীকার করলে অনেক কৃষক নীলকরদের অত্যাচারের শিকার হতেন। তাঁদের ভয় দেখানো ও মারধর করার ঘটনাও ঘটত।

নীল বিদ্রোহ চলাকালীন কৃষকদের ভূমিকা

১৮৫৯-৬০ সালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা নীলচাষের বিরুদ্ধে একজোট হন। তাঁরা নীল চাষ করতে অস্বীকার করেন এবং নীলকরদের অন্যায়ের প্রতিবাদ জানান। এই আন্দোলনই নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

নীলচাষিদের দুর্দশা নিয়ে দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ নাটক রচনা করেন। এই নাটকের মাধ্যমে নীলকরদের অত্যাচারের বিষয়টি আরও বেশি মানুষের সামনে আসে।

বিদ্রোহের পর কৃষকদের অবস্থা

নীল বিদ্রোহের ফলে ব্রিটিশ সরকার ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠন করে। কমিশন নীলচাষিদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে এবং জোর করে নীল চাষ করানোর বিরোধিতা করে। এর ফলে বাংলার নীলচাষের ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে।

তবে বিদ্রোহের পরেও কৃষকদের সব সমস্যা মিটে যায়নি। অনেক কৃষক ঋণ ও দারিদ্র্যের বোঝা থেকে সহজে মুক্তি পাননি।

নীলচাষ ও ঔপনিবেশিক অর্থনীতি

নীলচাষ ছিল কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ব্রিটিশদের শিল্পের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কৃষকদের নীল চাষে উৎসাহিত করা হতো। কিন্তু এর ফলে কৃষকদের নিজেদের খাদ্যশস্য চাষের সুযোগ কমে যেত।

নীলকররা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে নীল কিনে লাভ করতেন। অন্যদিকে কৃষকরা ঋণ ও কম দামের কারণে আর্থিক সমস্যায় পড়তেন। পরে কৃত্রিম নীলের ব্যবহার বাড়লে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা কমে যায়। এতে নীলচাষিদের সমস্যাও আরও বেড়ে যায়।

উপসংহার: নীল বিদ্রোহ ছিল নীলচাষিদের ওপর জোরজবরদস্তি ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিবাদ। এই আন্দোলন ঔপনিবেশিক কৃষি ব্যবস্থার দুর্বলতা ও কৃষকদের দুর্দশাকে সামনে নিয়ে আসে।

মনে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চালু করেন।
  • রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত: কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হতো।
  • মহলওয়ারি বন্দোবস্ত: গ্রাম বা গ্রামের জমির মালিকদের গোষ্ঠীর সঙ্গে বন্দোবস্ত করা হতো।
  • কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ: খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাজারে বিক্রির জন্য বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন।
  • নীল বিদ্রোহ: ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলায় সংঘটিত হয়।
  • দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা: ১৮৭৫ সালে মহাজনদের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন।
  • অবশিল্পায়ন: দেশীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের পতন।
  • সম্পদের বহির্গমন: দাদাভাই নওরোজির আলোচিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব।

Leave a Comment