WBBSE Class 8 History Chapter 2 Question and Answers

Class 8 History Chapter 2: MCQ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা

এই আর্টিকেলে WBBSE Class 8 History Chapter 2-এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর সহজ বাংলা ভাষায় দেওয়া হয়েছে। MCQ, SAQ এবং বড়ো প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অধ্যায়টি ভালোভাবে বুঝতে পারবে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (৩১টি)

১. ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে কোন মোগল সম্রাটের মৃত্যু হয়?

ক) শাহজাহান
খ) আকবর
গ) ঔরঙ্গজেব
ঘ) বাহাদুর শাহ

সঠিক উত্তর: গ) ঔরঙ্গজেব

ব্যাখ্যা: ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে বাংলার নবাব, হায়দরাবাদের নিজাম ও অযোধ্যার শাসকের মতো আঞ্চলিক শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে শুরু করেন।

২. বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব হিসেবে কাকে গণ্য করা হয়?

ক) আলিবর্দি খান
খ) মুর্শিদকুলি খান
গ) সিরাজ-উদ-দৌলা
ঘ) মির জাফর

সঠিক উত্তর: খ) মুর্শিদকুলি খান

ব্যাখ্যা: মুর্শিদকুলি খান মোগল সম্রাটের অধীনস্থ পদে নিযুক্ত থাকলেও বাংলায় নিজের শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭১৭ সালে তিনি বাংলার নাজিম ও দেওয়ানের দায়িত্ব পান। তাঁর শাসনকাল থেকেই বাংলায় কার্যত স্বাধীন নবাবি শাসনের সূচনা হয় বলে মনে করা হয়।

৩. মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজধানী কোথায় স্থানান্তরিত করেন?

ক) কলকাতা
খ) ঢাকা
গ) মুর্শিদাবাদ
ঘ) পাটনা

সঠিক উত্তর: গ) মুর্শিদাবাদ

ব্যাখ্যা: মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। তাঁর নাম অনুসারেই শহরটির নাম মুর্শিদাবাদ হয়। পরবর্তীকালে এই শহর বাংলার নবাবদের প্রশাসন ও রাজনীতির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

৪. হায়দরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

ক) সাদাৎ খান
খ) চিন কুলিচ খান (নিজাম-উল-মুলক)
গ) টিপু সুলতান
ঘ) মুর্শিদকুলি খান

সঠিক উত্তর: খ) চিন কুলিচ খান (নিজাম-উল-মুলক)

ব্যাখ্যা: চিন কুলিচ খান, যিনি নিজাম-উল-মুলক নামেও পরিচিত, ১৭২৪ সালে হায়দরাবাদে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে তিনি দাক্ষিণাত্যে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজ্য গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে হায়দরাবাদ কার্যত স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়।

৫. অযোধ্যা রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

ক) নিজাম-উল-মুলক
খ) মুর্শিদকুলি খান
গ) সাদাৎ খান
ঘ) সুজা-উদ-দৌলা

সঠিক উত্তর: গ) সাদাৎ খান

ব্যাখ্যা: সাদাৎ খান ১৭২২ সালে অযোধ্যায় নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মোগল সম্রাট তাঁকে বুরহান-উল-মুলক উপাধি দেন। দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় তিনি অযোধ্যায় নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলেন।

৬. মারাঠা আক্রমণ থেকে কলকাতাকে রক্ষা করার জন্য কোন খাল খনন করা হয়?

ক) গোবিন্দপুর খাল
খ) মারাঠা খাল
গ) সল্ট লেক
ঘ) টালির নালা

সঠিক উত্তর: খ) মারাঠা খাল

ব্যাখ্যা: অষ্টাদশ শতকে বাংলায় মারাঠা বর্গিদের আক্রমণে কলকাতার আশপাশের এলাকাতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই আক্রমণ থেকে শহরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কলকাতার চারদিকে একটি পরিখা খনন করা হয়। এটি ‘মারাঠা খাল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

৭. পলাশির যুদ্ধ কত খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়?

ক) ১৭৫৬
খ) ১৭৫৭
গ) ১৭৬৪
ঘ) ১৭৬৫

সঠিক উত্তর: খ) ১৭৫৭

ব্যাখ্যা: ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বাহিনীর মুখোমুখি হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী। মির জাফরসহ নবাবের কয়েকজন প্রভাবশালী সহযোগীর নিষ্ক্রিয়তা ও ষড়যন্ত্রের ফলে কোম্পানি জয়লাভ করে। এর মাধ্যমে বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পথ তৈরি হয়।

৮. পলাশির যুদ্ধে মির জাফরের ভূমিকা কী ছিল?

ক) তিনি সিরাজের সৈন্যদের উৎসাহিত করেন
খ) তিনি যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থেকে নবাবের বাহিনীকে দুর্বল করে দেন
গ) তিনি ব্রিটিশদের অস্ত্র সরবরাহ করেন
ঘ) তিনি দিল্লির সম্রাটকে সাহায্যের জন্য ডাকেন

সঠিক উত্তর: খ) তিনি যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থেকে নবাবের বাহিনীকে দুর্বল করে দেন

ব্যাখ্যা: মির জাফর সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাপতি ছিলেন। কিন্তু পলাশির যুদ্ধের সময় তিনি ও তাঁর অনুগত সেনারা কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে তাঁর গোপন সমঝোতা নবাবের বাহিনীর শক্তি কমিয়ে দেয় এবং কোম্পানির জয়ের পথ সহজ করে।

৯. ‘পলাশির লুণ্ঠন’ বলতে কী বোঝায়?

ক) পলাশির যুদ্ধের ময়দান লুট করা
খ) যুদ্ধের পর বাংলার বিপুল সম্পদ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাওয়া
গ) বাংলার গ্রামগুলিতে ডাকাতি
ঘ) নবাবের কোষাগার পুড়িয়ে দেওয়া

সঠিক উত্তর: খ) যুদ্ধের পর বাংলার বিপুল সম্পদ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাওয়া

ব্যাখ্যা: পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মকর্তারা বাংলার নবাবের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও উপহার আদায় করেন। কোম্পানির কর্মচারীরাও ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর সম্পদ সংগ্রহ করেন। বাংলার সম্পদ এভাবে কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনাকে ‘পলাশির লুণ্ঠন’ বলা হয়।

১০. বক্সারের যুদ্ধ কবে হয় এবং কোন পক্ষগুলি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে?

ক) ১৭৫৭ সালে সিরাজ-উদ-দৌলা ও ক্লাইভ
খ) ১৭৬৪ সালে মির কাশিম, সুজা-উদ-দৌলা ও দ্বিতীয় শাহ আলমের বাহিনী বনাম ব্রিটিশ কোম্পানি
গ) ১৭৬০ সালে মির জাফর ও হেক্টর মুনরো
ঘ) ১৭৬৫ সালে টিপু সুলতান ও কর্নওয়ালিস

সঠিক উত্তর: খ) ১৭৬৪ সালে মির কাশিম, সুজা-উদ-দৌলা ও দ্বিতীয় শাহ আলমের বাহিনী বনাম ব্রিটিশ কোম্পানি

ব্যাখ্যা: ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধ হয়। একদিকে ছিলেন বাংলার প্রাক্তন নবাব মির কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম। অন্যদিকে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী। হেক্টর মুনরোর নেতৃত্বে কোম্পানি এই যুদ্ধে জয়লাভ করে।

১১. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোন সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে?

ক) ১৭৫৭
খ) ১৭৬০
গ) ১৭৬৫
ঘ) ১৭৭২

সঠিক উত্তর: গ) ১৭৬৫

ব্যাখ্যা: ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদের চুক্তি ও সম্রাটের ফরমানের মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি অধিকার লাভ করে। এর ফলে এই অঞ্চলগুলির রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব কোম্পানির হাতে চলে যায়।

১২. দেওয়ানি অধিকার বলতে কী বোঝায়?

ক) সেনাবাহিনী পরিচালনার অধিকার
খ) রাজস্ব আদায়ের অধিকার
গ) বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের অধিকার
ঘ) ধর্মীয় কাজ পরিচালনার অধিকার

সঠিক উত্তর: খ) রাজস্ব আদায়ের অধিকার

ব্যাখ্যা: দেওয়ানি বলতে মূলত রাজস্ব আদায় ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রশাসনের অধিকারকে বোঝায়। ১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি প্রদান করেন। এর ফলে কোম্পানি এই তিনটি অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা পায়।

১৩. বাংলার দ্বৈত শাসনব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

ক) নবাব ও কোম্পানি সমান ক্ষমতায় শাসন করত
খ) প্রশাসনিক দায়িত্ব নবাবের হাতে থাকলেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে ছিল
গ) বাংলায় একই সঙ্গে দুজন নবাব শাসন করতেন
ঘ) হিন্দু ও মুসলমান আলাদাভাবে শাসন করতেন

সঠিক উত্তর: খ) প্রশাসনিক দায়িত্ব নবাবের হাতে থাকলেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে ছিল

ব্যাখ্যা: ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে, আর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নবাবের ওপর থাকত। ফলে প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত হলেও প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ নবাবের ওপর পড়ে।

১৪. বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কোন সালে দেখা দেয়?

ক) ১৭৭০
খ) ১৭৬৫
গ) ১৭৫৭
ঘ) ১৭৮০

সঠিক উত্তর: ক) ১৭৭০

ব্যাখ্যা: ১৭৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। খরা, ফসলের ক্ষতি, খাদ্যসংকট এবং রাজস্ব আদায়ের চাপ এই দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। বহু মানুষ অনাহারে প্রাণ হারান। এই দুর্ভিক্ষ বাংলার অর্থনীতি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

১৫. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি কে চালু করেন?

ক) রবার্ট ক্লাইভ
খ) লর্ড ওয়েলেসলি
গ) লর্ড কর্নওয়ালিস
ঘ) লর্ড ডালহৌসি

সঠিক উত্তর: খ) লর্ড ওয়েলেসলি

ব্যাখ্যা: লর্ড ওয়েলেসলি ১৭৯৮ সালে গভর্নর জেনারেল হিসেবে ভারতে আসেন। তাঁর শাসনকালে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়। এই নীতি গ্রহণ করলে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশ সেনা রাখতে এবং সেই সেনার খরচ বহন করতে হতো। বিনিময়ে তারা ব্রিটিশদের কাছ থেকে সামরিক সাহায্য পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেত।

১৬. স্বত্ববিলোপ নীতি কোন ব্রিটিশ শাসকের সময় কার্যকর হয়?

ক) লর্ড ওয়েলেসলি
খ) লর্ড ডালহৌসি
গ) লর্ড কর্নওয়ালিস
ঘ) ওয়ারেন হেস্টিংস

সঠিক উত্তর: খ) লর্ড ডালহৌসি

ব্যাখ্যা: লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন। তাঁর শাসনকালে স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে কয়েকটি দেশীয় রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই নীতি অনুযায়ী কোনো দেশীয় শাসকের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী না থাকলে দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে রাজ্যটি ব্রিটিশরা দখল করতে পারত।

১৭. টিপু সুলতান কোন রাজ্যের শাসক ছিলেন?

ক) হায়দরাবাদ
খ) মহীশূর
গ) অযোধ্যা
ঘ) বাংলা

সঠিক উত্তর: খ) মহীশূর

ব্যাখ্যা: টিপু সুলতান ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসক। তিনি হায়দার আলির পুত্র ছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে তিনি একাধিক যুদ্ধে অংশ নেন। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু হয়।

১৮. প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ কত খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়?

ক) ১৮৪৫
খ) ১৭৬৪
গ) ১৭৯৯
ঘ) ১৮৫৭

সঠিক উত্তর: ক) ১৮৪৫

ব্যাখ্যা: ১৮৪৫ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে শিখ বাহিনী ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ১৮৪৬ সালে লাহোরের চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে। এর ফলে পাঞ্জাবে ব্রিটিশদের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।

১৯. মুর্শিদকুলি খানের আমলে বাংলার বাণিজ্যে কোন বণিকগোষ্ঠীগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল?

ক) শুধু ফরাসি বণিকেরা
খ) হিন্দু, মুসলমান ও আর্মেনীয় বণিকেরা
গ) শুধুমাত্র ব্রিটিশ বণিকেরা
ঘ) শুধু পর্তুগিজ বণিকেরা

সঠিক উত্তর: খ) হিন্দু, মুসলমান ও আর্মেনীয় বণিকেরা

ব্যাখ্যা: মুর্শিদকুলি খানের সময় বাংলার বাণিজ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দেশীয় ও বিদেশি বণিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তাঁদের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান ও আর্মেনীয় বণিকেরা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। তাঁদের অনেকের হাতে বিপুল সম্পদ ছিল এবং বাংলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁদের প্রভাব দেখা যেত।

২০. ‘জগৎ শেঠ’ কীসের নাম?

ক) একজন সেনাপতির নাম
খ) একটি ধনী বণিক পরিবারের উপাধি
গ) একটি সামরিক পদ
ঘ) একটি ধর্মীয় উপাধি

সঠিক উত্তর: খ) একটি ধনী বণিক পরিবারের উপাধি

ব্যাখ্যা: ‘জগৎ শেঠ’ কোনো একজন ব্যক্তির নির্দিষ্ট নাম নয়; এটি বাংলার এক প্রভাবশালী ধনী বণিক পরিবারের উপাধি ছিল। ফতেহচাঁদ এই উপাধি লাভ করেন। তাঁদের হাতে বিপুল অর্থসম্পদ ও ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও এই পরিবারের প্রভাব ছিল।

২১. ব্রিটিশ শাসনকালে দেশীয় রাজদরবারে নিযুক্ত ‘রেসিডেন্ট’ কারা ছিলেন?

ক) দেশীয় রাজ্যের শাসক
খ) ব্রিটিশ কোম্পানির নিযুক্ত প্রতিনিধি
গ) রাজ্যের সেনাপতি
ঘ) রাজস্ব বিভাগের প্রধান

সঠিক উত্তর: খ) ব্রিটিশ কোম্পানির নিযুক্ত প্রতিনিধি

ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের দরবারে নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ করত। তাঁদের রেসিডেন্ট বলা হতো। তাঁরা রাজদরবারের কাজকর্মের ওপর নজর রাখতেন এবং কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক রাজ্যের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তাঁদের প্রভাব বাড়তে থাকে।

২২. সিরাজ-উদ-দৌলা কেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন?

ক) তিনি বাংলার সব বাণিজ্য বন্ধ করতে চেয়েছিলেন
খ) কোম্পানির দুর্গ নির্মাণ, দস্তকের অপব্যবহার ও নবাবের কর্মচারীকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে
গ) ধর্মীয় বিরোধের কারণে
ঘ) ফরাসিদের অনুরোধে

সঠিক উত্তর: খ) কোম্পানির দুর্গ নির্মাণ, দস্তকের অপব্যবহার ও নবাবের কর্মচারীকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে

ব্যাখ্যা: সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার নবাব হওয়ার পর ব্রিটিশ কোম্পানির কয়েকটি কাজের বিরোধিতা করেন। কোম্পানি নবাবের অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় দুর্গের সম্প্রসারণ করছিল এবং দস্তকের সুবিধা অপব্যবহার করে শুল্ক এড়াচ্ছিল। এ ছাড়া নবাবের বিরোধী কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয় দেওয়াও বিরোধের অন্যতম কারণ ছিল।

২৩. ‘দস্তক’ বলতে কী বোঝায়?

ক) এক ধরনের সামরিক অস্ত্র
খ) শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতিপত্র
গ) রাজস্ব আদায়ের অধিকার
ঘ) নবাবের সেনাবাহিনীর নির্দেশ

সঠিক উত্তর: খ) শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতিপত্র

ব্যাখ্যা: দস্তক ছিল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশেষ অনুমতিপত্র। ১৭১৭ সালে মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ারের ফরমানের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা পায়। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীদের একাংশ এই সুবিধার অপব্যবহার করায় নবাবের রাজস্ব আদায়ে সমস্যা দেখা দেয়।

২৪. এলাহাবাদের চুক্তি কত সালে স্বাক্ষরিত হয়?

ক) ১৭৫৭
খ) ১৭৬৪
গ) ১৭৬৫
ঘ) ১৭৭২

সঠিক উত্তর: গ) ১৭৬৫

ব্যাখ্যা: ১৭৬৫ সালে বক্সারের যুদ্ধের পর এলাহাবাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে তাঁর রাজ্য ফিরে পান। অন্যদিকে, মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি অধিকার প্রদান করেন।

২৫. পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ কী ছিল?

ক) নবাবের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না
খ) মির জাফর ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির ষড়যন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা
গ) প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ
ঘ) নবাবের সেনাবাহিনীর সংখ্যা খুব কম ছিল

সঠিক উত্তর: খ) মির জাফর ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির ষড়যন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা

ব্যাখ্যা: পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পেছনে তাঁর সেনাপতি মির জাফরসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ষড়যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধের সময় নবাবের বাহিনীর একটি বড় অংশ সক্রিয়ভাবে লড়াই করেনি। ফলে সৈন্যসংখ্যায় সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নবাবের পক্ষে জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

২৬. কোন যুদ্ধের জয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়?

ক) বক্সারের যুদ্ধ
খ) পলাশির যুদ্ধ
গ) এলাহাবাদের চুক্তি
ঘ) বন্দিবাসের যুদ্ধ

সঠিক উত্তর: খ) পলাশির যুদ্ধ

ব্যাখ্যা: ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। কোম্পানির সমর্থনে মির জাফর বাংলার নবাব হন। এর ফলে কোম্পানির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের জয় সেই কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

২৭. ওয়ারেন হেস্টিংস কে ছিলেন?

ক) বাংলার শেষ নবাব
খ) বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল
গ) ফরাসি সেনাপতি
ঘ) মারাঠা পেশোয়া

সঠিক উত্তর: খ) বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল

ব্যাখ্যা: ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৩ সালে বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর শাসনকালে বাংলার প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন আনা হয়। ১৭৭২ সালে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে কোম্পানি সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাঁর সময়েই কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়।

২৮. বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে কত সালে?

ক) ১৭৬৫
খ) ১৭৭২
গ) ১৭৮৫
ঘ) ১৭৯৩

সঠিক উত্তর: খ) ১৭৭২

ব্যাখ্যা: ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটান। এরপর কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর ফলে বাংলার শাসনব্যবস্থায় কোম্পানির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি পায়।

২৯. ১৭১৭ সালের ফারুখশিয়ারের ফরমানের ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কী সুবিধা পায়?

ক) বাংলায় সরাসরি শাসন করার অধিকার
খ) নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা
গ) বাংলার নবাব নিয়োগের অধিকার
ঘ) দ্বৈত শাসন চালু করার অধিকার

সঠিক উত্তর: খ) নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা

ব্যাখ্যা: ১৭১৭ সালে মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একটি ফরমান প্রদান করেন। এর ফলে কোম্পানি নির্দিষ্ট বার্ষিক অর্থের বিনিময়ে বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের বিশেষ সুবিধা পায়। পরবর্তীকালে এই সুবিধার অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে বাংলার নবাবদের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ তৈরি হয়।

৩০. মারাঠা শক্তির উত্থান ভারতের কোন অঞ্চলে ঘটেছিল?

ক) বাংলা
খ) দাক্ষিণাত্য ও পশ্চিম ভারত
গ) অযোধ্যা
ঘ) পাঞ্জাব

সঠিক উত্তর: খ) দাক্ষিণাত্য ও পশ্চিম ভারত

ব্যাখ্যা: মারাঠা শক্তির উত্থান মূলত দাক্ষিণাত্য ও পশ্চিম ভারতের অঞ্চলে ঘটে। শিবাজি মারাঠা শক্তির প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অষ্টাদশ শতকে মারাঠারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাতেও মারাঠা বর্গিদের আক্রমণ হয়েছিল।

৩১. অষ্টাদশ শতকে বাংলায় আক্রমণকারী মারাঠা অশ্বারোহীদের কী বলা হতো?

ক) ব্রিটিশ সৈন্য
খ) বর্গি
গ) আফগান সৈন্য
ঘ) ফরাসি সেনা

সঠিক উত্তর: খ) বর্গি

ব্যাখ্যা: অষ্টাদশ শতকে মারাঠা বাহিনীর অশ্বারোহী সৈন্যদের একটি অংশকে বর্গি বলা হতো। বাংলায় তাদের আক্রমণের ফলে বহু এলাকায় লুটপাট ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্গি আক্রমণের স্মৃতি বাংলা লোকসংস্কৃতিতেও রয়ে গেছে। ‘ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে’—এই ছড়াটি তারই পরিচিত উদাহরণ।

Class 8 History Chapter 2

SAQ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (২০টি)

১. অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর: অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বল হয়ে পড়ার পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।

১. ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দুর্বল উত্তরাধিকারীরা সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।
২. মোগল অভিজাতদের মধ্যে ক্ষমতা দখল ও উচ্চপদ লাভের প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
৩. জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় সংকট দেখা দেয়।
৪. কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ এবং বিভিন্ন বিদ্রোহ সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল করে দেয়।
৫. নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালির মতো বিদেশি আক্রমণকারীদের আক্রমণে মোগল সাম্রাজ্যের শক্তি আরও কমে যায়।

এই সমস্ত কারণে কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি স্বাধীনভাবে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

২. বাংলায় মুর্শিদকুলি খানের শাসনব্যবস্থার পরিচয় দাও।

উত্তর: মুর্শিদকুলি খান ১৭১৭ থেকে ১৭২৭ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসনভার পরিচালনা করেন। তাঁর শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।

১. তিনি বাংলার নাজিম ও দেওয়ান—উভয় পদের দায়িত্ব পালন করতেন।
২. তিনি ঢাকার পরিবর্তে মুর্শিদাবাদকে বাংলার রাজধানী করেন।
৩. রাজস্ব আদায়ের জন্য তিনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং দিল্লির মোগল সম্রাটকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠাতেন।
৪. ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যের সুযোগ দিলেও তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।
৫. তাঁর শাসনকালে বাংলার জমিদার ও ধনী বণিকদের মধ্যে কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।

তাঁর শাসনকালে বাংলায় মোগল সম্রাটের নামমাত্র কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও বাস্তবে নবাবের ক্ষমতা অনেকটাই স্বাধীন ছিল।

৩. আলিবর্দী খান কে ছিলেন? তাঁর শাসনকালের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

উত্তর: আলিবর্দী খান ১৭৪০ সালে বাংলার নবাব হন এবং ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি মুর্শিদকুলি খানের পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে যুক্ত ছিলেন। তাঁর শাসনকালের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলি হল—

১. ১৭৪০ সালে সরফরাজ খানকে পরাজিত করে তিনি বাংলার নবাব হন।
২. তাঁর শাসনকালে মারাঠা বর্গিদের বারবার আক্রমণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়।
৩. মারাঠাদের সঙ্গে ১৭৫১ সালের সন্ধির মাধ্যমে তিনি বাংলায় আক্রমণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
৪. ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্য করতে দিলেও তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানোর বিরোধী ছিলেন।
৫. তাঁর শাসনকালের শেষদিকে ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাবের বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৭৫৬ সালে আলিবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর নাতি সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার নবাব হন।

৪. হায়দরাবাদ রাজ্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

উত্তর: হায়দরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চিন কুলিচ খান, যিনি নিজাম-উল-মুলক নামে পরিচিত। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের একজন উচ্চপদস্থ অভিজাত ছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।

১৭২৩ সালে তিনি দাক্ষিণাত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শাসক মুবারিজ খানকে পরাজিত করেন। এরপর ১৭২৪ সালে হায়দরাবাদে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। মোগল সম্রাটের প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য বজায় রাখলেও তিনি বাস্তবে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন। এভাবেই হায়দরাবাদ একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজ্যে পরিণত হয়।

৫. অযোধ্যা রাজ্য কীভাবে স্বাধীনতা লাভ করেছিল?

উত্তর: অযোধ্যা রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাদাৎ খান। ১৭২২ সালে মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ তাঁকে অযোধ্যার শাসক নিযুক্ত করেন এবং বুরহান-উল-মুলক উপাধি দেন।

সাদাৎ খান অযোধ্যার রাজস্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। দিল্লির মোগল দরবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তিনি স্থানীয় অভিজাত ও জমিদারদের সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তাঁর সময়ে অযোধ্যার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপও বৃদ্ধি পায়। পরে তাঁর জামাতা সফদর জং অযোধ্যার শাসনভার গ্রহণ করেন। এইভাবে অযোধ্যা কার্যত স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়।

৬. ১৭৫৬ সালের কলকাতা অবরোধ ও ‘অন্ধকূপ হত্যা’ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরোধের ফলে ১৭৫৬ সালে নবাব কলকাতা আক্রমণ করেন। ২০ জুন নবাবের বাহিনী কলকাতা দখল করে। পরে সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতার নাম পরিবর্তন করে আলিনগর রাখেন।

কলকাতা দখলের পর ব্রিটিশ কর্মচারী জন জেফানিয়া হলওয়েল দাবি করেন, ১৪৬ জন বন্দিকে একটি ছোট ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে অধিকাংশের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাই ‘অন্ধকূপ হত্যা’ নামে পরিচিত।

তবে হলওয়েলের বর্ণনার সত্যতা নিয়ে পরবর্তীকালে প্রশ্ন ওঠে। ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়সহ কয়েকজন গবেষক এই বিবরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বন্দির সংখ্যা ও ঘটনার বিবরণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

৭. পলাশির যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল—

১. সিরাজ-উদ-দৌলার পরিবর্তে মির জাফরকে বাংলার নবাব করা হয়।
২. কোম্পানি ও তার কর্মকর্তারা নবাবের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও উপহার লাভ করেন।
৩. কলকাতায় কোম্পানির দুর্গ নির্মাণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পায়।
৪. কোম্পানি ২৪ পরগনার জমিদারি লাভ করে।
৫. বাংলার নবাবের দরবারে কোম্পানির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার রাজনীতিতে ব্রিটিশ কোম্পানির হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।

৮. বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মির কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে।

এই যুদ্ধের গুরুত্বগুলি হল—

১. পলাশির যুদ্ধের পর বাংলায় কোম্পানির যে প্রভাব তৈরি হয়েছিল, বক্সারের যুদ্ধের পর তা আরও শক্তিশালী হয়।
২. তিনজন গুরুত্বপূর্ণ শাসকের সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হওয়ায় কোম্পানির সামরিক ক্ষমতা প্রমাণিত হয়।
৩. ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদের চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে।
৪. অযোধ্যার ওপরও কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

এই যুদ্ধের পর কোম্পানি শুধু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে।

৯. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কী? এর কারণ ও ফলাফল লেখো।

উত্তর: ১৭৭০ সালে বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। বাংলা সনের ১১৭৬ সালে এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে এর এমন নামকরণ করা হয়েছে।

কারণ: ১. দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাবে কৃষিকাজ ব্যাহত হয় এবং ফসলের উৎপাদন কমে যায়।
২. খাদ্যশস্যের অভাবের মধ্যেও কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের চাপ অব্যাহত ছিল।
৩. খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়ে।
৪. দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফলাফল: ১. দুর্ভিক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়।
২. কৃষিকাজ ও গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. বহু কৃষক জমি ও জীবিকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
৪. বাংলার জনজীবন ও অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।

১০. দ্বৈত শাসনব্যবস্থা কী? এই ব্যবস্থার অসুবিধাগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করার পর বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব ছিল কোম্পানির হাতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল নবাবের হাতে।

এই ব্যবস্থার প্রধান অসুবিধাগুলি ছিল—

১. নবাবের হাতে প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল না।
২. কোম্পানি রাজস্ব আদায় করলেও সাধারণ মানুষের কল্যাণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত না।
৩. প্রশাসনিক দায়িত্ব ও আর্থিক ক্ষমতা আলাদা হওয়ায় শাসনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
৪. কৃষক ও সাধারণ মানুষ রাজস্বের চাপ এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থার শিকার হন।

এই ব্যবস্থার ফলে বাংলার প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটান।

১১. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি কী? এই নীতির শর্তগুলি কী ছিল?

উত্তর: লর্ড ওয়েলেসলি দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তারের জন্য অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণ করেন। এই নীতির মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশ কোম্পানির সামরিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হতো।

এই নীতির প্রধান শর্তগুলি ছিল—

১. দেশীয় রাজাকে নিজের রাজ্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী রাখতে হতো।
২. সেই সেনাবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ রাজাকেই বহন করতে হতো।
৩. ব্রিটিশদের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা যেত না।
৪. রাজা ব্রিটিশদের অনুমতি ছাড়া অন্য ইউরোপীয় শক্তির কর্মচারীদের নিজের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করতে পারতেন না।
৫. বিনিময়ে ব্রিটিশ কোম্পানি রাজ্যটিকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিত।

এই নীতির ফলে দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীনতা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।

১২. স্বত্ববিলোপ নীতি কী? এই নীতির মাধ্যমে কোন কোন রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়?

উত্তর: লর্ড ডালহৌসির শাসনকালে স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করা হয়। এই নীতি অনুসারে কোনো দেশীয় রাজ্যের শাসকের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী না থাকলে তাঁর দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ব্রিটিশ সরকার সেই রাজ্য নিজের অধীনে নিতে পারত।

এই নীতির মাধ্যমে ব্রিটিশরা কয়েকটি দেশীয় রাজ্য দখল করে। উল্লেখযোগ্য রাজ্যগুলি হল—

১. সাতারা — ১৮৪৮
২. সম্বলপুর — ১৮৪৯
৩. ঝাঁসি — ১৮৫৪
৪. নাগপুর — ১৮৫৪

এই নীতির ফলে দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার স্বীকার না করায় তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হন।

১৩. টিপু সুলতান সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর: টিপু সুলতান ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসক এবং হায়দার আলির পুত্র। তিনি ১৭৮২ সালে পিতার মৃত্যুর পর মহীশূরের শাসনভার গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

টিপু সুলতান সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ব্রিটিশদের মোকাবিলা করার জন্য তিনি ফরাসিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন। চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের মধ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে শ্রীরঙ্গপত্তনম রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

১৪. সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পিছনে একাধিক কারণ ছিল।

১. নবাবের দরবারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর বিরোধিতা করেন।
২. মির জাফর, জগৎ শেঠসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্রিটিশদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করেন।
৩. পলাশির যুদ্ধে মির জাফর নবাবের সেনাপতি হয়েও সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেননি।
৪. নবাবের বাহিনীর একটি বড় অংশ যুদ্ধের সময় নিষ্ক্রিয় ছিল।
৫. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কূটনীতি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাবের বিরোধীদের নিজেদের পক্ষে আনে।

এই সমস্ত কারণে সিরাজ-উদ-দৌলার সামরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পলাশির যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন।

১৫. রবার্ট ক্লাইভ ও পলাশির লুণ্ঠন সম্পর্কে কী জানো?

উত্তর: রবার্ট ক্লাইভ ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সেনাপতি ও প্রশাসক। ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধে তিনি কোম্পানির বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে জয়ের পর তাঁর সহযোগিতায় মির জাফর বাংলার নবাব হন।

নবাব হওয়ার বিনিময়ে মির জাফর কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও উপহার দেন। রবার্ট ক্লাইভও ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর অর্থ ও সম্পদ লাভ করেন। পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাওয়ার এই ঘটনাকে ‘পলাশির লুণ্ঠন’ বলা হয়।

এই সম্পদ অর্জনের ফলে কোম্পানির আর্থিক শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং বাংলার রাজনীতিতে তাদের প্রভাব আরও বাড়ে।

১৬. মির কাশিম কেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধিতা করেছিলেন?

উত্তর: মির কাশিম ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহায্যে বাংলার নবাব হন। কিন্তু কিছুদিন পরেই কোম্পানির সঙ্গে তাঁর বিরোধ শুরু হয়।

এই বিরোধের প্রধান কারণগুলি ছিল—

১. কোম্পানির কর্মচারীরা দস্তকের অপব্যবহার করে শুল্ক না দিয়ে বাণিজ্য করছিলেন।
২. এর ফলে বাংলার রাজস্ব আদায়ে ক্ষতি হচ্ছিল এবং দেশীয় বণিকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছিলেন।
৩. মির কাশিম কোম্পানির এই সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।
৪. দেশীয় বণিকদের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির জন্য তিনি অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য শুল্ক তুলে দেন।
৫. কোম্পানি তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।

এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পরিণত হয়। ১৭৬৩ সালে সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে মির কাশিম বাংলা ছেড়ে চলে যান।

১৭. স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে ভারতীয়দের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল?

উত্তর: স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে ভারতের দেশীয় রাজা ও তাঁদের অনুগামীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। এই নীতির কারণে কয়েকটি দেশীয় রাজ্য ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়।

১. দেশীয় রাজারা নিজেদের রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় ব্রিটিশদের বিরোধিতা করতে শুরু করেন।
২. দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় বহু রাজপরিবার ক্ষুব্ধ হয়।
৩. রাজ্য দখলের ফলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের কর্মচারী ও সৈন্যদের জীবিকা বিপন্ন হয়।
৪. ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার অস্বীকার করায় রানি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।

এই নীতির ফলে সৃষ্ট অসন্তোষ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

১৮. মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ারের ১৭১৭ সালের ফরমানের গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: ১৭১৭ সালে মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরমান প্রদান করেন। এই ফরমানের মাধ্যমে কোম্পানি বাংলায় বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করে।

১. নির্দিষ্ট বার্ষিক অর্থের বিনিময়ে কোম্পানি বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ পায়।
২. কোম্পানির পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দস্তক ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া হয়।
৩. কোম্পানি মুর্শিদাবাদের টাঁকশাল ব্যবহারেরও বিশেষ সুবিধা লাভ করে।

এই ফরমানের ফলে বাংলায় কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে কোম্পানির কর্মচারীদের দস্তকের অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে নবাবদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়।

১৯. সিরাজ-উদ-দৌলা ও ব্রিটিশ কোম্পানির মধ্যে আলিনগরের সন্ধির শর্তগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১৭৫৬ সালে সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা দখল করার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে কলকাতা পুনরুদ্ধার করে। এরপর ১৭৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিরাজ-উদ-দৌলা ও কোম্পানির মধ্যে আলিনগরের সন্ধি হয়।

এই সন্ধির প্রধান শর্তগুলি ছিল—

১. ব্রিটিশ কোম্পানি পূর্বে পাওয়া বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধাগুলি ফিরে পায়।
২. কোম্পানির ক্ষতিপূরণের দাবি মেনে নেওয়া হয়।
৩. কলকাতায় কোম্পানির দুর্গ নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়া হয়।
৪. কোম্পানিকে নিজস্ব মুদ্রা প্রচলনের অনুমতি দেওয়া হয়।

এই সন্ধির ফলে বাংলায় ব্রিটিশ কোম্পানির অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

২০. অষ্টাদশ শতকে বাংলার বাণিজ্যে কোন কোন ইউরোপীয় কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত?

উত্তর: অষ্টাদশ শতকে বাংলার বাণিজ্যে প্রধানত তিনটি ইউরোপীয় কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

১. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: বাংলায় বাণিজ্য করার পাশাপাশি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
২. ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলে। তবে পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের প্রভাব কমে যায়।
৩. ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: বাংলায় চন্দননগর ছিল তাদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছিল।

এই কোম্পানিগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ক্রমশ রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নেয়। এর ফলে বাংলার রাজনীতিতে ইউরোপীয় শক্তিগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

Class 8 History – Broad Questions (বড়ো প্রশ্নোত্তর)

১. অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। কীভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলি উত্থান লাভ করেছিল? বাংলা, হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার উদাহরণ দাও।

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল।

১. ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু ও দুর্বল উত্তরসূরি: ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সিংহাসনে একের পর এক দুর্বল শাসক বসেন। তাঁরা সাম্রাজ্যের বিশাল অঞ্চলকে আগের মতো শক্ত হাতে শাসন করতে পারেননি। ফলে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

২. অভিজাতদের মধ্যে বিরোধ: মোগল দরবারের অভিজাতরা নিজেদের ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে পড়েন। তাঁদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয় এবং সম্রাটের ক্ষমতাও কমতে থাকে।

৩. সামরিক শক্তির অবনতি: সময়ের সঙ্গে মোগল সেনাবাহিনীর শক্তি ও দক্ষতা কমে যায়। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যের বাইরের আক্রমণকারীরা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৭৩৮-৩৯ সালে নাদির শাহের আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে আহমদ শাহ আবদালির আক্রমণে দিল্লি ও মোগল সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৪. জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থার সংকট: মোগল সাম্রাজ্যে অভিজাতদের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গির ছিল না। এই সংকটের ফলে রাজস্ব আদায়ের ওপর চাপ বাড়ে। কৃষকদের দুরবস্থা দেখা দেয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু হয়।

৫. প্রাদেশিক শাসকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি: কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হওয়ার সুযোগে বিভিন্ন প্রদেশের শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে থাকেন। তাঁরা দিল্লির সম্রাটের প্রতি আনুগত্য দেখালেও বাস্তবে নিজেদের মতো করে রাজ্য পরিচালনা করতে শুরু করেন।

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সময় বাংলা, হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার মতো অঞ্চলে শক্তিশালী শাসকের উত্থান ঘটে।

বাংলা: মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজস্ব ও প্রশাসনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭১৭ সাল থেকে তিনি কার্যত স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতে থাকেন। তিনি মুর্শিদাবাদকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন।

হায়দরাবাদ: চিন কুলিচ খান, যিনি নিজাম-উল-মুলক নামে পরিচিত, ১৭২৪ সালে হায়দরাবাদে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মোগল সম্রাটের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার কথা বলা হলেও রাজ্যের প্রশাসন মূলত তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

অযোধ্যা: ১৭২২ সালে সাদাৎ খান অযোধ্যার শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি রাজস্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে দিল্লির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেন।

এইভাবে মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রদেশে আঞ্চলিক শাসকেরা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।


২. বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধের কারণগুলি কী ছিল? পলাশির যুদ্ধ কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তার মূল্যায়ন করো।

সিরাজ-উদ-দৌলা ও ব্রিটিশ কোম্পানির বিরোধের কারণ

বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের পিছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণ ছিল।

১. অনুমতি ছাড়া দুর্গ নির্মাণ: নবাবের অনুমতি ছাড়াই ব্রিটিশ কোম্পানি কলকাতায় দুর্গ মজবুত করতে থাকে। তারা পরিখা খনন ও অন্যান্য সামরিক প্রস্তুতিও চালায়। নবাব এই কাজকে নিজের কর্তৃত্বের বিরোধী বলে মনে করেন।

২. দস্তকের অপব্যবহার: মোগল সম্রাটের দেওয়া দস্তক ব্যবহার করে কোম্পানির কর্মচারীরা শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্য করত। অনেক কর্মচারী ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও এই সুবিধা কাজে লাগাতেন। ফলে বাংলার নবাবের রাজস্ব আদায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

৩. কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয় দেওয়া: নবাবের বিরোধী রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে ব্রিটিশরা কলকাতায় আশ্রয় দেয়। নবাব তাঁকে ফেরত চাইলেও কোম্পানি সেই দাবি মানেনি। এতে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।

৪. নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: সিরাজ-উদ-দৌলার বিরোধী কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ঘসেটি বেগম, জগৎ শেঠ ও মির জাফরের মতো ব্যক্তিদের নিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র গড়ে ওঠে।

পলাশির যুদ্ধের তাৎপর্য

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হন। এই যুদ্ধের ফলে বাংলার রাজনীতিতে বড়ো পরিবর্তন ঘটে।

১. রাজনৈতিক পরিবর্তন: যুদ্ধের পর মির জাফরকে বাংলার নবাব করা হয়। কিন্তু তিনি স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে পারেননি। কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

২. অর্থনৈতিক প্রভাব: যুদ্ধের পর কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা বাংলার নবাবের কাছ থেকে বিপুল অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা লাভ করে। বাংলার সম্পদ কোম্পানির বাণিজ্য ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিতে কাজে লাগে।

৩. কোম্পানির ক্ষমতা বৃদ্ধি: পলাশির আগে কোম্পানি মূলত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল। যুদ্ধের পর তারা বাংলার শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়। এভাবেই তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়তে থাকে।

৪. ব্রিটিশ শাসনের পথ তৈরি: পলাশির যুদ্ধের পর বাংলায় কোম্পানির প্রভাব ক্রমশ বাড়ে। পরবর্তী সময়ে বক্সারের যুদ্ধ ও দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে এই প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়।

সুতরাং, পলাশির যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি বাংলায় ব্রিটিশ রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।


৩. বক্সারের যুদ্ধ ও এলাহাবাদের চুক্তির গুরুত্ব আলোচনা করো। দেওয়ানি লাভ কীভাবে বাংলার তথা ভারতের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল?

বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪)

পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। কিন্তু নবাব মির কাশিম কোম্পানির অন্যায় বাণিজ্যিক সুবিধা ও হস্তক্ষেপ মেনে নিতে চাননি। এই বিরোধ থেকেই সংঘর্ষ শুরু হয়।

মির কাশিম অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন। ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে এই যৌথ বাহিনী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়।

এলাহাবাদের চুক্তি (১৭৬৫)

বক্সারের যুদ্ধের পর ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভের উদ্যোগে এলাহাবাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—

১. সুজা-উদ-দৌলা ক্ষতিপূরণ দিয়ে অযোধ্যার শাসনভার ফিরে পান। তবে কারা ও এলাহাবাদ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের হাতে দেওয়া হয়।

২. দ্বিতীয় শাহ আলম একটি ফরমানের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি অধিকার প্রদান করেন।

৩. এর বিনিময়ে কোম্পানি মোগল সম্রাটকে বছরে ২৬ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

দেওয়ানি লাভের গুরুত্ব

১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। এর ফলে ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

১. কোম্পানির অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি: দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানি বিশাল অঞ্চলের রাজস্ব আদায় করতে পারত। এই অর্থ তাদের বাণিজ্য ও সামরিক শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

২. দ্বৈত শাসনের সূচনা: কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেলেও প্রশাসনের দায়িত্ব নবাবের হাতে ছিল। ফলে বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য ছিল না।

৩. কৃষকদের দুর্দশা: কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের চাপ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে কৃষকদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বহু মানুষ প্রাণ হারান।

৪. ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ভিত্তি: দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানি শুধু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজস্বের অর্থ ব্যবহার করে তারা সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়।

অতএব, বক্সারের যুদ্ধ ও এলাহাবাদের চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানির ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হয়। দেওয়ানি লাভ ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।


৪. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ও স্বত্ববিলোপ নীতি কী? এই দুই নীতি কীভাবে ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলির পতন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে সহায়তা করেছিল?

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি

লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটানোর জন্য অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি চালু করেন। এই নীতির মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়।

এই নীতির প্রধান শর্তগুলি ছিল—

১. দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিজেদের রাজ্যে ব্রিটিশ সেনা রাখতে হতো এবং সেই সেনাবাহিনীর খরচ বহন করতে হতো।

২. ব্রিটিশ কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কোনো দেশীয় শাসক অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন না।

৩. দেশীয় রাজদরবারে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট থাকতেন। তিনি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতেন।

৪. দেশীয় রাজ্যগুলি নিজেদের স্বাধীন সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলত।

হায়দরাবাদ ১৭৯৮ সালে এবং অযোধ্যা ১৮০১ সালে এই নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে ওই রাজ্যগুলির ওপর ব্রিটিশ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। মহীশূরের টিপু সুলতান ব্রিটিশদের অধীনতা মেনে নিতে চাননি। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে তিনি নিহত হন।

স্বত্ববিলোপ নীতি

লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি গ্রহণ করেন। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো দেশীয় রাজ্যের শাসকের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী পুত্র না থাকলে তাঁর দত্তক পুত্রকে অনেক ক্ষেত্রে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। ফলে সেই রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসত।

এই নীতির সাহায্যে ব্রিটিশরা সাতারা (১৮৪৮), সম্বলপুর (১৮৪৯), ঝাঁসি (১৮৫৪) ও নাগপুর (১৮৫৪)-এর মতো রাজ্য নিজেদের অধীনে আনে।

ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার ব্রিটিশরা মেনে নেয়নি। এই সিদ্ধান্ত তাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরোধের একটি কারণ হয়ে ওঠে। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দুই নীতির প্রভাব

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলির সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অন্যদিকে, স্বত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে একাধিক রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই দুই নীতির ফলে দেশীয় শাসকদের স্বাধীনতা ক্রমশ কমে যায় এবং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার সহজ হয়।


৫. মির কাশিম ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের কারণ ও ফলাফল কী ছিল? ‘দ্বৈত শাসন’ ও ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ সম্পর্কে আলোচনা করো।

মির কাশিম ও ব্রিটিশ কোম্পানির বিরোধের কারণ

মির কাশিম বাংলার নবাব হওয়ার পর নিজের শাসনক্ষমতা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা ও প্রশাসনে হস্তক্ষেপের কারণে তাঁর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।

১. দস্তকের অপব্যবহার: কোম্পানির কর্মচারীরা দস্তক ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও শুল্ক ছাড় পেতেন। এর ফলে বাংলার রাজস্ব আদায়ে ক্ষতি হচ্ছিল। মির কাশিম এই অনিয়ম বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।

২. শুল্ক নিয়ে বিরোধ: কোম্পানির কর্মচারীরা শুল্ক ছাড়ের সুবিধা ভোগ করলেও দেশীয় বণিকদের শুল্ক দিতে হতো। এই বৈষম্য দূর করতে মির কাশিম দেশীয় বণিকদের জন্যও অভ্যন্তরীণ শুল্ক তুলে দেন। এতে কোম্পানির কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা কমে যায়।

৩. কোম্পানির হস্তক্ষেপ: মির কাশিম নিজের প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানি তার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে অনড় ছিল। ফলে দুই পক্ষের বিরোধ আরও বাড়ে।

বিরোধের ফলাফল

এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে রূপ নেয়। ১৭৬৩ সালে কোম্পানির সঙ্গে সংঘর্ষে মির কাশিম পরাজিত হন এবং অযোধ্যায় আশ্রয় নেন। এরপর ১৭৬৪ সালে তিনি সুজা-উদ-দৌলা ও দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে মিলে বক্সারের যুদ্ধে অংশ নেন। সেখানেও যৌথ বাহিনী পরাজিত হয়। পরবর্তীকালে কোম্পানি মির জাফরকে আবার বাংলার নবাব করে।

দ্বৈত শাসন (১৭৬৫-১৭৭২)

১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় কোম্পানির হাতে ছিল রাজস্ব আদায়ের অধিকার বা দেওয়ানি। অন্যদিকে, নবাবের হাতে ছিল আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের দায়িত্ব বা নিজামত।

কোম্পানি রাজস্ব আদায় করলেও সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক দায়িত্ব সরাসরি গ্রহণ করেনি। ফলে শাসনব্যবস্থায় নানা সমস্যা দেখা দেয়। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস এই দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটান।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০)

বাংলায় ১৭৭০ সালে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বাংলা সনের ১১৭৬ সালে এই দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল বলে এটি ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত।

অনাবৃষ্টি ও ফসলহানির কারণে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের চাপ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। বহু মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যান। দুর্ভিক্ষের সময়ও রাজস্ব আদায়ের নীতি নিয়ে কোম্পানির ভূমিকা সমালোচিত হয়।

দ্বৈত শাসনের দুর্বলতা এবং দুর্ভিক্ষের সময় প্রশাসনিক সমস্যাগুলি বাংলার সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়িয়ে দেয়।


৬. রেসিডেন্ট ব্যবস্থা কী? কীভাবে এটি ভারতীয় দেশীয় শক্তিগুলির সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করেছিল? মারাঠা, মহীশূর ও অযোধ্যার উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করো।

রেসিডেন্ট ব্যবস্থা

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশীয় রাজ্যগুলির দরবারে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে রেসিডেন্ট নিয়োগ করত। প্রথমদিকে তাঁদের কাজ ছিল কোম্পানির বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দেখাশোনা করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা দেশীয় রাজ্যগুলির প্রশাসন ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন।

রেসিডেন্টরা অনেক সময় রাজাদের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব খাটাতেন। ফলে দেশীয় শাসকদের স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনার ক্ষমতা কমে যায়।

বিভিন্ন রাজ্যে রেসিডেন্ট ব্যবস্থার প্রভাব

১. অযোধ্যা: ১৮০১ সালের চুক্তির পর অযোধ্যার নবাব ব্রিটিশদের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রাজ্যের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রেসিডেন্টের মাধ্যমে কোম্পানি অযোধ্যার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। ১৮৫৬ সালে কুশাসনের অভিযোগ তুলে ব্রিটিশরা অযোধ্যা দখল করে।

২. মহীশূর: ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর মহীশূরে ওয়াড়িয়ার বংশের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাজ্যটির ওপর ব্রিটিশদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। রেসিডেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানি মহীশূরের প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে।

৩. মারাঠা: মারাঠা শক্তির প্রধান কেন্দ্র ছিল পেশোয়ার দরবার। ব্রিটিশরা মারাঠা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে এবং পেশোয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে। দ্বিতীয় বাজিরাও ১৮০২ সালে ব্রিটিশদের সঙ্গে বসেইনের চুক্তি করেন। এর ফলে মারাঠা রাজনীতিতে কোম্পানির প্রভাব বাড়ে। পরবর্তী সংঘর্ষের পর ১৮১৮ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের অবসানে পেশোয়ার ক্ষমতা শেষ হয়।

রেসিডেন্ট ব্যবস্থার ফলাফল

রেসিডেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্রিটিশরা দেশীয় রাজ্যগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। রাজারা অনেক ক্ষেত্রেই নামমাত্র শাসকে পরিণত হন। তাঁদের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় দেশীয় রাজ্যগুলির সার্বভৌমত্ব ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


৭. সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি সময়রেখার মাধ্যমে উপস্থাপন করো। পলাশি ও বক্সার কোন্ অর্থে ভারত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?

১৭০৭ থেকে ১৭৬৫ সালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

সালঘটনা
১৭০৭মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু।
১৭১৭মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ারের ফরমানের মাধ্যমে ইংরেজ কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করে।
১৭১৭-১৭২৭মুর্শিদকুলি খান বাংলায় কার্যত স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
১৭২২সাদাৎ খান অযোধ্যায় নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
১৭২৪নিজাম-উল-মুলক হায়দরাবাদে স্বাধীন শাসনের ভিত্তি গড়ে তোলেন।
১৭৩৮-১৭৩৯নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন এবং দিল্লি লুণ্ঠন করেন।
১৭৪০আলিবর্দি খান বাংলার নবাব হন।
১৭৫৬সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা দখল করেন।
১৭৫৭পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ঘটে।
১৭৬৪বক্সারের যুদ্ধে ব্রিটিশ কোম্পানি মির কাশিম, সুজা-উদ-দৌলা ও দ্বিতীয় শাহ আলমের যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করে।
১৭৬৫এলাহাবাদের চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে।

পলাশি ও বক্সারের যুদ্ধের তাৎপর্য

পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭): পলাশির যুদ্ধের পর মির জাফর বাংলার নবাব হন। কিন্তু কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এই যুদ্ধের ফলে কোম্পানির বাণিজ্যিক ক্ষমতা রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নিতে থাকে।

বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪): বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানি মির কাশিম, অযোধ্যার নবাব ও মোগল সম্রাটের যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করে। এর ফলে কোম্পানির সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।

দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫): এলাহাবাদের চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। এর ফলে কোম্পানি নিজস্ব রাজস্বের অর্থ ব্যবহার করে সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হয়।

এই ঘটনাগুলির মাধ্যমে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি ধীরে ধীরে শাসনক্ষমতা অর্জন করে। তাই পলাশি, বক্সার ও দেওয়ানি লাভকে ভারতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


৮. জগৎ শেঠ কাদের উপাধি? বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে জগৎ শেঠদের ভূমিকা কতটা ছিল? পলাশির যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাঁদের ভূমিকা পর্যালোচনা করো।

জগৎ শেঠ কারা ছিলেন?

‘জগৎ শেঠ’ ছিল বাংলার এক প্রভাবশালী বণিক ও অর্থলগ্নিকারী পরিবারের উপাধি। ফতেহচাঁদ মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের কাছ থেকে এই উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও এই উপাধি ব্যবহার করেন।

বাংলার অর্থনীতিতে জগৎ শেঠদের ভূমিকা

১. অর্থলগ্নিকারী হিসেবে ভূমিকা: জগৎ শেঠ পরিবার বাংলার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যাংকার ছিল। তাঁরা নবাব, বণিক ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ঋণ দিতেন।

২. রাজস্ব ও অর্থনৈতিক কাজে প্রভাব: বাংলার রাজস্ব আদায়, অর্থের লেনদেন এবং টাঁকশালের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ফলে বাংলার অর্থনীতিতে তাঁদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল।

৩. কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও অর্থের প্রয়োজনে জগৎ শেঠদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। তাঁদের আর্থিক ক্ষমতার কারণে বাংলার রাজনীতি ও বাণিজ্যে পরিবারটির গুরুত্ব ছিল।

বাংলার রাজনীতিতে জগৎ শেঠদের ভূমিকা

জগৎ শেঠ পরিবার মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারে প্রভাবশালী ছিল। নবাবদের আর্থিক প্রয়োজনে তাঁরা ঋণ দিতেন। ফলে রাজদরবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতের গুরুত্ব ছিল।

পলাশির যুদ্ধে জগৎ শেঠদের ভূমিকা

সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে জগৎ শেঠ পরিবারের সম্পর্ক ভালো ছিল না। নবাবের বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল। পলাশির যুদ্ধের আগে মির জাফরকে বাংলার নবাব করার ষড়যন্ত্রে জগৎ শেঠ পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ কোম্পানিও সিরাজের বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই ষড়যন্ত্রের ফলে পলাশির যুদ্ধে নবাবের সেনাবাহিনীর একটি বড়ো অংশ নিষ্ক্রিয় থাকে। সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর মির জাফর নবাব হন এবং কোম্পানির প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার

জগৎ শেঠ পরিবার শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বাংলার রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পলাশির যুদ্ধের আগে নবাববিরোধী ষড়যন্ত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।


মনে রাখবে

  • ১৭০৭: ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু এবং মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা বৃদ্ধি।
  • ১৭১৭: ফারুখশিয়ারের ফরমান— ইংরেজ কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা।
  • মুর্শিদকুলি খান: বাংলার কার্যত স্বাধীন শাসক।
  • ১৭৫৭: পলাশির যুদ্ধ— বাংলার রাজনীতিতে কোম্পানির প্রভাব বৃদ্ধি।
  • ১৭৬৪: বক্সারের যুদ্ধ— কোম্পানির সামরিক শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ১৭৬৫: দেওয়ানি লাভ— বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার কোম্পানির হাতে যায়।
  • ১৭৭০: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর— বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
  • অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি: লর্ড ওয়েলেসলি।
  • স্বত্ববিলোপ নীতি: লর্ড ডালহৌসি।

Leave a Comment